সকাল ৬:৫২, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

 আমদানি নির্ভর বাজারেই আদা-পেঁয়াজের ঝাঁজ

আজকের সারাদেশ ডেস্ক:

দেশে আদা ও পেয়াজের চাহিদার অধিকাংশই দেশীয় উৎপাদন থেকে আসলেও এই দুই পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রন করেন আমদানিকারকরা। আমাদনি নির্ভর বাজার হওয়ায় আদা ও পেঁয়াজ কিনতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন ভোক্তারা। এরমধ্যে এখন এই দুই পণ্যের আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারেও চলছে অস্থিরতা।

খুচরা বাজারে এখন যে আদা বেচাকেনা চলছে, সেটি মূলত মিয়ানমারের। তবে দেশি ও মিয়ানমারের আদা দেখতে প্রায় কাছাকাছি হওয়ায় দুই আদার দামের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই। রাজধানীর খুচরা বাজারের ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রতিকেজি আদা ৩৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে তাদের। এক মাস আগেও আদার দাম ছিল ১০০ টাকার মধ্যে। ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণের তথ্য বলছে, গত এক মাসের ব্যবধানে প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে আদার দাম।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ডলারের বিনিময় মূল্য বৃদ্ধির  কারণে আমদানি পণ্যের মূল্য স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি এখন। তাছাড়া বাংলাদেশে আদার বেশিরভাগ আমদানি হতো চীন থেকে। ব্যবসায়ীরা মাসখানেকের বেশি সময় ধরে চীন থেকে আদা আমদানি করছেন না, কারণ চীন নিজেই এখন আমদানিকারক। চীন থেকে আদা আমদানি করে বাজার পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতি কেজির দাম ৩৭০ টাকা পড়ে বলে দাবি আমদানিকারকদের। 

এর চেয়ে তুলনামূলক কম খরচ এবং দ্রুত আমদানি করতে পারায় মিয়ানমার থেকে আদার আমদানি হচ্ছে। সেটাও গত রোজার ঈদের সময় স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ার ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ নিয়ে বাজারে দাম বাড়াতে থাকে। 

শ্যামবাজারের আমদানিকারক হাজী মো. মাজেদ বলেন, “চায়না থেকে আদা আনতে কেজিতে ৩৭০ টাকা খরচ পড়ে। যেটা দেশে বিক্রি করা কষ্টকর। যে কারণে মিয়নমার থেকেই আদা আমদানি হচ্ছে, তবে ডলার সংকটের কারণে চাহিদা মত আমদানি করা যাচ্ছে না। এর বাইরে ভারত ও ভিয়েতনাম থেকে সামান্য কিছু আদা আসছে।”

আমদানিকারকা জানান, শ্যামবাজারে পাইকারিতে আদা বিক্রি হচ্ছে ২২০ থেকে ২৪০ টাকা কেজি দরে। 
খাতুনগঞ্জের কাঁচাপণ্য ব্যবসায়ী মেসার্স সিআরজি ট্রেডিং অ্যান্ড কোং এর স্বত্বাধিকারী চন্দন কুমার পোদ্দার বলেন, “দেশিয় বাজারে বছরের বেশিরভাগ সময় দেশি ও চীনা আদার প্রভাব থাকে বেশি। কিন্তু এখন দেশি ও চীনা আদা কোনোটিই বাজারে নেই। মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের কিছু আদা থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম। মূলত সরবরাহ সংকটের কারণে বাজারে আদার দাম অস্থির। বর্তমানে প্রতিকেজি মিয়ানমারের আদা ২৪০ থেকে ২৪৫ ও ভিয়েতনামের আদা ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি। 

চট্টগ্রামের কাঁচাপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স জারিফা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জুনায়েদুল হক বলেন, “আসন্ন কোরবানির ঈদকে ঘিরে আমরা আদা আমদানির ঋণপত্র খুলতে গিয়ে দেখি, আন্তর্জাতিক বাজারে (চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনাম) আদার বুকিং দর ১৬০ থেকে ১৮০ টাকার মধ্যে। যা ভ্যাট-ট্যাক্স ও পরিবহন খরচ যোগ করে দেশের বাজারে পৌঁছাতে প্রায় ২৫০ টাকা খরচ পড়বে। সেই দামে দেশের বাজারে আদা বিক্রিতে লোকসানের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই অনেকেই লোকসানের ঝুঁকিতে আমদানি করেনি।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল দেশে প্রতি বছর ৩.৫ থেকে ৪ লাখ মেট্রিকটন আদার চাহিদা রয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ২০২১ অর্থবছরে আড়াই লাখ মেট্রিক টন আদা উৎপাদন হয়েছে স্থানীয়ভাবে। বাকিটা আমদানি করা হয়। তবে চাহিদার অর্ধেকেরও কম অংশ আমদানি করা হলেও বাজারের স্থিতিশীলতা অনেক ক্ষেত্রেই আমদানির ওপর নির্ভর করে। 

যেমনটা দেখা যায়, পেঁয়াজের ক্ষেত্রেও। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ৩৬ লাখ টন, যেখানে চাহিদা মাত্র ২৬-২৮ লাখ টন। কিন্তু ৩৫-৪০ শতাংশ পেঁয়াজের স্টোরেজ সিস্টেমের দুর্বলতার কারণে নষ্ট হয়, যেটি পোস্ট হার্ভেস্ট লস হিসেবে পরিচিতি। যে কারণে এখন পেঁয়াজের আমদানি দরকার হয়। 

তবে আমদানির পরিমাণ সামান্য হলেও সেটাই মূলত বাজারের নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। 

চলতি বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ভালো হয়েছে বলে দাবি কৃষি মন্ত্রণালয়ের, একইসঙ্গে আবার প্রস্তুতি রয়েছে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের। যে কারণে সরকার উৎপাদন মৌসুমে পেঁয়াজের আমদানি বন্ধ করে রেখেছিল। এরপর স্থানীয় বাজারে গত রোজার ঈদের আগ পর্যন্ত ৩৩-৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে পেঁয়াজ। 

এখন প্রতিকেজি পেঁয়াজের দাম ৮০ টাকা। টিসিবি বলছে, গত এক মাসেই পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ৫৩ শতাংশ, তাও আবার বর্তমান দাম ৭০ টাকা হিসাব ধরে।

অর্থাৎ, রোজা শেষ হওয়ার পর থেকেই ধাপে ধাপে বাড়তে থাকা পেঁয়াজের দাম এখন দ্বিগুণেরও বেশি। 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমদানিকারকরা বাজারে এক ধরনের চাপ তৈরি করেছে, যে কারণে পেঁয়াজের দাম ধীরে ধীরে বেড়েছে। যাতে করে সরকার আমদানির অনুমতি দিতে বাধ্য হয়। 

কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, যখন পেঁয়াজের দাম ৫০-৬০ টাকা ওঠে তখন সরকার চিন্তা করেছে উৎপাদনকারী অর্থাৎ কৃষক ভালো দাম পাচ্ছে। কারণ এ বছর পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ ৩০ টাকার কাছাকাছি। তাই তখনো আমদানির অনুমতি দেয়নি। 

কিন্তু এটা ৮০ টাকায় ওঠার পর সরকার আমদানির অনুমতি দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক প্রায় সপ্তাহখানেক আগে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, আরও ২-৩ দিন বাজার দেখে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। 

তবে আমদানিকারকরা জানান, এখনো তারা আমদানির আমদানির অনুমতি পাননি।

আজকের সারাদেশ/২৭মে/এএইচ