রাত ১২:০৭, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘এভাবে মাটিতেই থাকুন সবচেয়ে উঁচু তারা’

‘ক্রিকেট ঈশ্বরে’র বিদায়ের দিনের একেবারে শেষের মুহূর্ত। ওয়াংখেড়ের আকাশে-বাতাসে ‘শচীন’ ‘শচীন’ কান্নার রব ততক্ষণে কিছুটা প্রশমিত। এর মধ্যেই ভারত দলে মুম্বাইয়ের প্রতিনিধিত্ব করা দুই তরুণকে ডাকলেন লিটল মাস্টার। নাম দুটি রোহিত শর্মা আর আজিঙ্কা রাহানে। শচীন দুজনকে মুখোমুখি করে বললেন, ‘আমি চললাম। আজ থেকে মুম্বাইয়ের পতাকা আকাশে উড়ানোর দায়িত্ব তোমাদের। কথা দাও রাখবে।’

প্রতিত্তোরে রোহিত স্বাভাবিকভাবে সংযত, কিন্তু রাহানে? আবেগ সামলাতে না পেরে কেঁদে ফেললেন। পরে তাঁর সেই কান্না থামান অঞ্জলি টেন্ডুলকার।

শেন ওয়ার্ন আদর করে নাম দিয়েছিলেন ‘জিঙ্ক।’ সেটিই মুখে মুখে ঘুরে ফিরতে ফিরতে তাঁর ‘ডাকনাম’ হয়ে গেছে। অনেকে আবার আজ্জু বলেও ডাকেন। জিঙ্ক কিংবা আজ্জু নামের এই লোকটাই ভারত দলে আমার সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটার। এর কারণ, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তার সোনা ফলানো ব্যাটিংয়ের জন্য নয়, শুধু একটি শব্দের জন্য-বিনয়ী। এই পরিচয়ে যে তিনি অনবদ্য, ভারত দলে তার আগে পরে কেউ নেই…

কয়েকবছর আগে কোটলায় আউট হওয়ার পর কটাক্ষ করেছিলেন সুনীল গাভাস্কার। তাচ্ছিল্যের সুরে বলছিলেন, খাঁটি মুম্বাই ব্যাটসম্যানও বুঝি এভাবে আউট হয়?

বিনিময়ে একটুও রাগ দেখানো দূরে থাক। উল্টো অগ্রজের প্রতি সশ্রদ্ধায় অবনত হয়ে উচ্চারণ করেছিলেন-‘স্যার তো ঠিকই বলেছেন। পরবর্তীতে আমার লক্ষ্য থাকবে আরও মজবুত ব্যাটিং করে ওঁকে দেখানো যে-স্যার আমি পেরেছি।’

পুরো ক্রিকেটজীবনে মিডিয়ার সম্মুখে কম কথা বলা মহেন্দ্র সিংহ ধোনী মনে হয় সবচেয়ে বিতর্কিত মন্তব্যটা করেছেন এই রাহানাকে ঘিরেই-‘রাহানে ওয়ানডেতে দ্রুত মারতে পারে না।’ এই বলে কতবার যে ওয়ানডে থেকে ছুঁড়ে মেরেছেন তাঁকে।
অথচ এর বিপরীতে একটা গরম শব্দও কখনো বলেননি রাহানে। নরম সুরে বারবার বলে গিয়েছেন, ‘আমাকে স্ট্রাইক রেট বাড়াতে কাজ করতে হবে।’ অতচ তখন অলরেডি টেস্ট দলের ভাইস ক্যাপ্টেন হয়ে গেছে লোকটা। চাইলে নিজের গ্রহণযোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে প্রভাব কাটাতেই পারতেন। কিন্তু রাহানের পোশাকের নাম যে বিনয়।

অবশ্য স্ট্রাইক রেট বাড়ানোর কাজটা ভেতরে ভেতরে যে করে গেছেন ‘টেস্ট স্পেশালিস্ট’ স্বান্ত্বনা পুরস্কার নিজের করে নেয়া রাহানে-তার নজির তো এই আইপিএলেই দেখা গেছে, তাও ধোনিরই সামনে!

চেন্নাই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে সবাই সেই পুরোনো গীত-ধোনির বরফশীতল মস্তিষ্কককেই সব কৃতীত্ব দিচ্ছেন।

অথচ নিজের স্বভাবজাত খেলা থেকে বেরিয়ে রাহানে নামের লোকটা যে ১১ ইনিংসে ৩২.৬ গড় আর চোখ ধাঁধানো ১৭২.৪৯ স্ট্রাইক রেটে ৩২৬ রান করেছেন তা নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য হলো না।

উল্টো কোথায় পুরোনো মন্তব্যের জন্য ধোনিকে খোঁচা দেবেন চিরবিনয়ী রাহানে নিজেই ফাইনাল শেষে বলে দিলেন, ‘এবছর আইপিএল বেশ উপভোগ করেছি। এর পুরো কৃতিত্ব মাহি ভাইয়ের!’

তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফরে বিরাটের অনুপস্থিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে দলকে বিরল সিরিজ জিতিয়েছিলেন আজ্জু। মেলবোর্ন টেস্টে তো কামিন্স, স্টার্ক, হেজেলউড-লায়ন; বিশ্বের সেরা চার বোলারের নাক আর চোখের জল একাকার করে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরও মাছরাঙার মতো শিকারি চোখে ডাগ আউটের পাশে হন্য হয়ে বসে থাকা ফটোগ্রাফারদের একটা ভালো ছবি তোলার সুযোগ হয়নি! কেননা, রাহানে যে সেদিন শতরানের পরও কী এক সাধারণ উদযাপন করেছিলেন। যেন ব্যাটটা একটু তুলতে হয়, তাই তোলা…

অন্য কেউ হলে হয়তো সেঞ্চুরির পর মাটি আর শরীরের মধ্যে প্রার্থক্য তৈরি করা উদযাপন হতো। বুনো হুংকারে তলোয়ার দিয়ে কোঁপানোর মতো ব্যাটকে নাড়িয়ে যেতেন অনেকক্ষণ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকেই শাসন করার এই সুযোগ যে বারেবারে আসে না। কিন্তু রাহানে নামের লোকটা যেন দলকে বাঁচাতে পেরেই খুশি।

কাল তো পরিস্থিতি আরও বিপক্ষে ছিল। ভারতের ক্রিকেট আকাশ থেকে প্রায় মলিন হয়ে যাওয়া। কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে বাদ। শ্রেয়স আয়ারের উত্থানে নিজের বিদায়ের দেয়াললিখনও যেন দেখে ফেলেছিলেন। যার জন্য দলের বাইরে সেই আয়ারের ইনজুরিই ১৮ মাস পর রাহানেকে নিয়ে গেল ইংল্যান্ডে। আয়ার সুস্থ হলেই পড়তে পারেন বাদ। তাই যা করার দ্রুতই করার আকাশসম চাপ। বহু খারাপ সংবাদের আশঙ্কার কালো মেঘ মাথায় নিয়ে বাইশগজে নেমে দেখলেন তিনি এক ‘নিংসঙ্গ শেরপা’! এরপরের গল্পটাতো শুধু রাহানেময়!

বলিউডের বিখ্যাত চিত্রনাট্যকার সেলিম-জাভেদ জুটিও মনে হয় প্রত্যাবর্তন নিয়ে এমন দুর্দান্ত চিত্রনাট্য লিখতে পারতেন না, আজ ওভালে যা লিখলেন রাহানে।

ক্যামেরন গ্রিন ওই অতিমানবিয় ক্যাচটা না ধরলে হয়তো সেঞ্চুরিও হয়ে যেত! অবশ্য সেঞ্চুরি না হলেও কোনোভাবেই মহত্ত্ব কমবে না রাহানের ৮৯ রানের ইনিংসটার। ধুঁকতে থাকা দলকে যে টেনে তুলছে সেঞ্চুরির চেয়েও বড় এই ইনিংসটা! স্বাভাবিকভাবে অন্য কেউ হলে প্রচারের সব আলো নিজের করে নিতে চাইতেন আজ।

কিন্তু রাহানে? দেড়শ কোটি মানুষের হৃদয়ে পানি এনে দেয়া
দুর্দান্ত এক ইনিংসের পরও কোথায় মাথা উঁচু করে করে চতুর্দিকে হাত তালি দেয়া দর্শকদের দিকে ব্যাট ঘোরাতে ঘোরাতে মাঠ ছাড়বেন, কৃতীত্ব নেবেন, উল্টো দলকে আরও সহযোগিতা করতে পারেননি বলে আফসোস করতে করতে মাঠ ছাড়লেন ঘাসদের দিকে চেয়ে চেয়ে।

‘এভাবে মাটিতেই থাকুন, সবচেয়ে উঁচু তারা।’

লেখা: তাসনীম হাসান, সংবাদকর্মী

আজকের সারাদেশ/১০জুন/এসএম