সকাল ৬:৩৮, সোমবার, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

৭ পেরিয়ে ৮ বছরে কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন

রুমান হাফিজ:

দিনটি ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই। সিলেট নগরীর এডু এইড স্কুলে এক ঝাঁক উদ্যমী তারুণ্যের সম্মিলন। উদ্দেশ্য শিক্ষা-দীক্ষা ও উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া কানাইঘাট উপজেলাকে সুশিক্ষার আলোয় আলোকিত করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। ফলস্বরূপ ‘কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন’ (কেএসএ) এর পথচলা শুরু।

উপজেলার সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর অরাজনৈতিক সেবামূলক এ সংগঠন এরই মধ্যে পেরিয়েছে প্রতিষ্ঠার ৭ বছর। শিক্ষা ও সেবার প্রেরণায় উজ্জ্বীবিত করে আলোর পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সংগঠনটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়নরত কানাইঘাট উপজেলার শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে জন্ম লাভের পরপরই সংগঠনটি শিক্ষা ও সেবার প্রেরণা নিয়ে উপজেলার সর্বস্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

অল্পদিনের মধ্যেই সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয় উপজেলার শত শত শিক্ষার্থী। কেন্দ্রীয় কমিটির বাইরেও প্রতিটি ইউনিয়নে সংগঠনের শাখা কমিটি গঠন করা হয়।

শিক্ষায় কেএসএ:

দরিদ্র ও অসহায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাড়ানোসহ বিভিন্ন ধরণের শিক্ষা ও সেবামূলক কার্যক্রমে সংগঠনটি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বিশেষত উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুক শিক্ষার্থীদেরকে সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান সবসময়ই অব্যাহত রয়েছে। মেধাবী ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদেরকে নিয়মিত সংবর্ধনা প্রদান সংগঠনের আরেকটি অনুপ্রেরণামূলক কার্যক্রম। শিক্ষার মান উন্নয়নের মাধ্যমে অসহায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচী প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া সংগঠনটির মূল লক্ষ্য। ২০১৯ সালে ‘মাদক,সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে ছাত্র সমাজের ভূমিকা’ শীর্ষক শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে উপজেলা প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন।

২০১৭ সালের ২৭ মে কেএসএ সদর ইউনিয়ন শাখার উদ্যোগে মেধা মূল্যায়ন পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলার ছোটদেশ-নয়াবাজারে আয়োজিত পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে অর্ধশত শিক্ষার্থীকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। একই বছরের মার্চ মাসে রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন শাখার উদ্যোগে শিশুদের মাঝে সৃজনশীল বই বিতরণ করা হয়।

আলোকিত মানুষে গড়ার লক্ষ্যে পাঠাগার আন্দোলন গড়ে তোলা সংগঠনের আরেকটি অন্যতম উদ্যোগ। যার ফলশ্রুতিতে সংগঠনের উদ্যোগে রাজাগঞ্জ ইউনিয়নে স্থাপিত হয়েছে ‘কিশোর পাঠাগার’। এছাড়াও সদর ইউনিয়নে অবস্থিত ‘ধূমকেতু গণপাঠাগারে সংগঠনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বই প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে উপজেলার সর্বত্র আরও পাঠাগার স্থাপন এবং উপজেলার অভ্যন্তরে যেসব গণপাঠাগার আগে থেকেই বই পড়া কর্মসূচি চালিয়ে আসছে সেসব পাঠাগারকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে সংগঠনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত বই প্রদানের ক্ষেত্রে সংগঠন আন্তরিক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

সামাজিক কাজে সংগঠন:

করোনা মহামারীর সময়ে কানাইঘাট উপজেলায় অপরাধ প্রবণতা বেড়ে গেলে সংগঠনের পক্ষ থেকে কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ প্রভৃতি ঘটনায় সংগঠনের জরুরি পদক্ষেপের ফলে অনেক অপরাধীদেকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়। কানাইঘাট উপজলায় ফৌজদারী অপরাধ দমন ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কানাইঘাট থানা প্রশাসনের সহায়তায় কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন উপজেলার সকল সামাজিক সংগঠনকে সমবেত করে ‘সম্মিলিত সামাজিক জোট’ গঠন করে।

২০২০ সালের ২১ আগস্ট কানাইঘাট পৌরসভাস্থ কানাইঘাট পাবলিক হাই স্কুলে আয়োজিত এক সভায় উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এ সামাজিক জোট ঘোষণা করা হয়। ফৌজদারী অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সংগঠনের করণীয় এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংগঠনগুলোর কী কী ভূমিকা নেওয়া উচিত- সে বিষয়ে কানাইঘাট থানা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঐ সভায় বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর কিছুদিনের মধ্যে ‘ফৌজদারী অপরাধ প্রতিরোধে সামাজিক সংগঠনের করণীয়’ বিষয় নিয়ে কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের উদ্যোগে লক্ষ্মীপ্রাসাদ পশ্চিম ইউনিয়ন, কানাইঘাট সদর ইউনিয়ন এবং রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের সামাজিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে তিনটি পৃথক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

এসোসিয়েশনের নবগঠিত কমিটির সভাপতি আল আমিন আহমদ চৌধুরী বলেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই ৭ বছরে সংগঠন ছাত্রসমাজকে গুরুত্ব দিয়ে একটি আলোকিত উপজেলার গড়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করে আসছে। আশাকরি কেএসএর এই প্রয়াস অব্যাহত থাকবে। উপজেলার উন্নয়নের পক্ষে যত রকম বাধা রয়েছে, সেসব দূর করার জন্য সংগটনটি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমাদের সবার ভালোবাসার সংগটন অতীতের মতো আগামীতেও বড় ভূমিকা রাখবে। সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে আমাদের সংগটন আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে। সময়ের পরিক্রমায় ৮ বছরে পা দিয়েছে কেএসএ। গণমানুষের পক্ষে আরও প্রত্যয়ী হবে এর কণ্ঠ। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সবাইকে আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানাই।

কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আসিফ আযহার বলেন, শিক্ষা-দীক্ষা ও উন্নয়নে পিছিয়ে পড়া কানাইঘাট উপজেলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে ২০১৬ সালের কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। যাত্রা শুরুর পর থেকে নানান প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সংগঠনের কার্যক্রম এগিয়ে যেতে থাকে। ধারাবাহিক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বেশ অল্পদিনের মধ্যেই সংগঠনটি পুরো উপজেলার ছাত্রসমাজের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়।

তিনি আরো বলেন, করোনা মহামারী পর থেকে সংগঠনের কার্যক্রমে কিছুটা স্থবিরতা নেমে আসে। কিন্তু মহামারীর মধ্যেও সীমিত পরিসরে সংগঠনের কাজ চলতে থাকে। ২০২০ ও ২১ সালে সংগঠনের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উচ্চ শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে দেশের বাইরে (কানাডা, ডেনমার্ক, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশে) চলে যান। এতে সংগঠনের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ২০২২ সালে একটি আহ্বায়ক কমিটির হাতে সংগঠনের দায়িত্ব তোলে দেওয়া হয়। বিগত ৮ জুলাই ২০২৩ তারিখে উক্ত আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে একটি আংশিক কার্যকরি কমিটি ঘোষণা করা হয়। কানাইঘাট উপজেলার ছাত্রসমাজ এ কমিটিকে নিয়ে আশাবাদী। এ কমিটি সংগঠনকে অতীতের মতোই গতিশীল ধারায় পরিচালিত করতে পারবে বলে সবার আশা।


লেখক: সাধারণ সম্পাদক: কানাইঘাট স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন (কেএসএ)