সকাল ৬:৪৫, সোমবার, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কুংফু মাস্টার থেকে আরসা কমান্ডার

সাইফুল আফ্রিদি, কক্সবাজার:

আরসা কমান্ডার নুর মোহাম্মদ আরসাতে যোগ দেওয়ার আগেই ছিলেন এজজন কুংফু মাস্টার। কুংফু দক্ষকতা অর্জন করে মিয়ানমার থাকাকালীন। তখনও রোহিঙ্গারা বাস্তুচ্যুত হয়নি। রাখাইনে থাকতেই কুংফুতে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে অর্জন করেন ‘ব্ল্যাক বেল্ট’।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালে আরাকান স্যালভেনশন আর্মি ( আরসা) ‘র সদস্য আরিফউদ্দিনের সাহচর্যে নুর মোহাম্মদ যোগ দেন সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা’য়। যোগ দেয়ার পর থেকে আরসা সদস্যদের কুংফু প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন তিনি। তার পারদর্শীতায় অল্প সময়েই সেকশন কমান্ডারের দায়িত্ব পান নুর মোহাম্মদ। এর মাঝে নুর মোহাম্মদ সখ্যতা গড়ে তোলেন আরসার সামরিক শাখার প্রধান ওস্তাদ খালেদের সাথে। খালেদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখতেন নুর মোহাম্মদ। এসব তথ্য উঠে আসে র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে।

এরই মধ্যে নিজেকে আরো যোগ্য করে তুলতে আরসা’র সামরিক প্রধান ওস্তাদ খালেদের কাছ থেকে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ ও আরসা’র মূল
সংগঠক আরিফ উদ্দিন, হাসেম,কুইল্লা এর কাছ থেকে বোমা তৈরীর প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে আরো দক্ষ করে তোলেন। অস্ত্র চালনা,কুংফু ও বোমা তৈরির দক্ষতা অর্জন করে নিজেকে আরো পাকাপোক্ত করেন নুর মোহাম্মদ।

পরবর্তীতে ২০১৭ সালে বাস্তুচ্যুত মায়ানমারের নাগরিকদের সাথে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন তিনি। শরণার্থী হিসেবে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প-৮ এ অবস্থান করতে থাকে হাফেজ নুর মোহাম্মদ। সেখানেও তিনি প্রভাব বিস্তার করে ক্যাম্প-৮ এ আরসার হেড জিম্মাদার হিসেবে দায়িত্ব পায়।

ক্যাম্পে অবস্থান করে তার নেতৃত্বে গড়ে তোলেন আরসা’র ৩০-৩৫ জন সদস্যের একটি টিম। সেই টিমের নেতৃত্ব দেন নুর মোহাম্মদ। কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় অপহরণ,চাঁদাবাজি, ডাকাতি,মাদক,খুন আধিপত্য বিস্তারে এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনায় দক্ষ হাতে নেতৃত্ব দেন তিনি।

তার নেতৃত্বেই কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পের আরসার সদস্যরা খুন, টার্গেট কিলিং, অপহরণ, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন ধরণের অপরাধ কর্মকান্ড পরিচালনা করে। পুরোদমে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে উঠেন তার দলটি। তার নেতৃত্বে ক্যাম্প হয়ে উঠে সন্ত্রাসীদের আতুড়ঘর,ক্যাম্প অনিরাপদ হয়ে উঠে সাধারণ রোহিঙ্গাদের জন্য। নুর মোহাম্মদ ধীরে ধীরে সন্ত্রাসী সংগঠন আরসার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে টার্গেট করতে থাকে ক্যাম্পের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের।

র্যাবের বিবৃতিতে উঠে আসে, তার পরিকল্পনায় ক্যাম্পে সংঘটিত হয় আলোচিত কয়েক হত্যাকান্ড। হেড মাঝি শফি উল্লাহ হত্যাকান্ড, সালাম হত্যাকান্ড, সলিম হত্যাকান্ড, মালেক হত্যাকান্ড, হাবুইয়া হত্যাকান্ড, ইমান হত্যাকান্ড, আবুল মুনসুর হত্যাকান্ড, সালেহ হত্যাকান্ড, এছাড়াও জোরপূর্বক একজন মহিলার ঘরে প্রবেশের সময় বাধা দিলে তাকে গুলি করে হত্যাকান্ড ঘটায় এই কমান্ডার। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আলোচিত ০৬ জন হত্যাকান্ডসহ বিভিন্ন হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত ছিল আরসা কমান্ডার হাফেজ নুর মোহাম্মদ।

সন্ত্রাসী সংগঠন আরসা’র জন্য চাঁদা সংগ্রহ এবং আরসা’র শীর্ষ নেতাদের নিকট থেকে প্রাপ্ত অর্থ ক্যাম্পের জিম্মাদারদের মাঝে বণ্টন করত নুর মোহাম্মদ। ফলে ক্যাম্পে প্রভাব বাড়তে থাকে তার। ২০২২ সালের নভেম্বরে গোয়েন্দা সংস্থা ও র‍্যাবের মাদকবিরোধী যৌথ অভিযানের সময় সন্ত্রাসীদের হামলায় গোয়েন্দা সংস্থার একজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা নিহত হন। উক্ত সন্ত্রাসী হামলায় একজন র‍্যাব সদস্যও গুরুত্র আহত হন। ওই হামলার পরিকল্পনার একজন হিসেবেও ছিলেন নুর মোহাম্মদ।

উক্ত হত্যাকান্ডের সাথে সে সরাসরি জড়িত ছিল এবং ঘটনাস্থলে নিজে উপস্থিত থেকে উক্ত কর্মকর্তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন বলে জানা যায়।

ফলে ধীরে ধীরে আরসা কমান্ডার নুর মোহাম্মদ বাংলাদেশ প্রশাসনের টার্গেটে পরিণত হন। তাকে ধরতে ক্যাম্প ও ক্যাম্পের বাইরে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে (২১ জুলাই) র্যাবের অভিযানে ধরা পড়েন নুর মোহাম্মদ।

তবে নুর মোহাম্মদ প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে কক্সবাজারের গহীন পার্বত্য এলাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে থাকতো বলে স্বীকারোক্তি দেন র্যাবের কাছে। তার বিরুদ্ধে উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়িসহ বিভিন্ন থানায় হত্যা, অপহরণ, অস্ত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে ১৫ এর অধিক মামলা রয়েছে বলে জানা যায়।

আজকের সারাদেশ/২৩জুলাই/এএইচ