সন্ধ্যা ৭:৪০, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হাসিলের টাকা চসিকের কর্মকর্তার ‘পকেটে’, ইজারাদার পথে ঘুরছেন

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর একান্ত সচিব আবুল হাশেমের বিরুদ্ধে একটি বাজারের ইজারাদারকে ‘পুলিশে দেয়ার’ হুমকি দিয়ে নিজেদের লোক দ্বারা হাসিল তোলার অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে ওই ইজারদার মেয়রকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন।

চসিক ও ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চসিকের মালিকানাধীন নগরীর বিবিরহাট কাঁচাবাজারের ইজারার জন্য গত ৬ মার্চ দরপত্রে অংশ নেন সাইফুল ইসলাম। তিনি মনোনীত হলে ১৪ এপ্রিল ২০২৩ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৪ অর্থাৎ এক বছরের জন্য বাজারের ইজাদারহার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। গত ৪ এপ্রিল সাইফুল ইজারা-সংক্রান্ত বাবদ ১৪ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪৫টাকা চসিককে পরিশোধ করেন। 

কিন্তু হাসিল আদায়ের অনুমতি পাওয়ার জন্য সাইফুল বারবার অনুমতি চাইলেও অদৃশ্য কারণে সেটি আটকে থাকে প্রায় চারমাস ধরে। এ সময় ছাত্রলীগ নাম ব্যবহার করে চলা ছিনতাই-চাঁদাবাজীসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত স্থানীয় নুরুল বশর বিপলু ও মো. হায়দার নামের দুই ভাই ওই বাজারের হাসিল তুলতে থাকে। তাঁদের সঙ্গে চসিকের এস্টেট শাখার কর্মচারী মোহাম্মদ রফিকও থাকতেন। অনেক দৌড়ঝাঁপের পর ২৪ জুলাই সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের সই করা এক চিঠিতে সাইফুলকে বাজার থেকে টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়।

এর মধ্যে সাইফুল ‍গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় আমমোক্তারনামা দলিলের (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) মাধ্যমে তাঁর বড় ভাই মোহাম্মদ আকতার হোসেনকে বাজার থেকে হাসিল আদায়ের দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন। চসিক থেকে অনুমতি পাওয়ার পর আকতার হোসেন বাজার থেকে হাসিল তুলতে গেলে বিপলু ও হায়দারসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী বাধা দেন এবং চসিকের পক্ষ থেকে তাঁদের হাসিল তোলার দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানান। হাসিল তুলতে না পেরে আবারও চসিকের বিভিন্ন কর্মকর্তার দপ্তরে যাওয়া-আসা করতে থাকেন আকতার। এভাবে চলতে থাকে অন্তত একমাস। কিন্তু তাঁদের কাছে সমাধান না পাওয়ায় এক পর্যায়ে গত ২০ আগস্ট অবৈধভাবে চাঁদা উত্তোলনকারীদের উচ্ছেদ করে বাজার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য মেয়রের কাছে লিখিতভাবে আবেদন করেন সাইফুল। মেয়র বিষয়টি জানার পর তাঁরই নির্দেশে একান্ত সচিব আবুল হাশেম বাজারে গিয়ে ২৬ আগস্ট সাইফুলকে ইজারার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন এবং হাসিল তোলার জন্য বলেন। এরপর তিন দিন বাজারে নির্বিঘ্নভাবে হাসিল তোলেন সাইফুলের ভাই আকতার। কিন্তু ৪ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ২ মিনিটে আকতারকে ফোন করে আবুল হাশেম হাসিল না তোলার জন্য নির্দেশ দেন এবং চসিকের লোকজন হাসিল তুলবে বলে জানান। পাশাপাশি আকতার যদি হাসিল তুলতে যান তাহলে তাঁকে পুলিশে দেয়ার হুমকিও দেন। পরদিন বিকেল চারটার দিকে বাজারে গিয়ে আকতার দেখতে পান চসিকের এস্টেট শাখার কর্মচারী রফিক, বিপলু ও হায়দারকে নিয়ে হাসিল তুলছেন। এখনো তাঁরাই বাজারের হাসিল তুলছেন, আর ইজারাদার হয়েও তুলতে পারছেন না সাইফুলের ভাই আকতার।

এ বিষয়ে পুনরায় গত রোববার (১০ সেপ্টেম্বর) ঘটনার পুরো বিবরণ তুলে ধরে মেয়রের কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ করেছেন সাইফুল।

সাইফুল ইসলাম বার্তা২৪.কমকে বলেন, আমি অসুস্থ থাকায় আমার বড় ভাই আকতার হোসেনকে বাজারের ইজারার দায়িত্ব বুঝিয়ে দিই। তিনি আমাকে ইজারাবাবদ সব টাকা পরিশোধ করেন। কিন্তু আমার ভাই মাত্র তিনবার হাসিল তুলতে পারেন। এ কারণে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আকতার হোসেন মেয়রের একান্ত সচিব আবুল হাশেম এস্টেট শাখার কর্মচারী রফিকের মাধ্যমে স্থানীয় দুই বখাটে বিপলু ও হায়দারকে ব্যবহার করে বাজারের হাসিল তুলছেন বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, আমাকে প্রথম চারমাস ইজারা তুলতে দেওয়া হয়নি। ওই সময় রফিক দুই সন্ত্রাসীকে নিয়ে হাসিল তুলতেন। এখনোও তাঁরা হাসিল তুলছেন।

প্রতি সপ্তাহে শনি ও মঙ্গলবার বিকেলে কাঁচাবাজার বসে বিবিরহাটে। প্রতিদিন ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা হাসিল উঠে। সে হিসেবে প্রতি মাসে প্রায় ১ লাখ টাকা হাসিল উঠে কাচাবাজার থেকে। আর বিভিন্ন দোকান থেকে আসে ৫০ হাজার টাকা মতো। অর্থাৎ প্রতি মাসে সবমিলিয়ে দেড় লাখ টাকা আসে।

জানতে চাইলে মেয়রের একান্ত সচিব আবুল হাশেম সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘ওই ইজারাদারের সঙ্গে অংশীদারীত্ব নিয়ে দুজনের (বিপলু ও হায়দার) ঝামেলা আছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার শঙ্কায় ওই ইজারাদারের বদলে চসিক নিজ উদ্যোগে হাসিল তুলছে।’ যদিও ইজারাদার সাইফুল জানিয়েছেন, বিপলু ও হায়দার তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নন।

ইজারাদারকে বাদ দিয়ে বিপলু ও হায়দারকে নিয়ে চসিকের  এস্টেট শাখার কর্মচারী রফিক হাসিল তুলেছেন কেন, এমন অভিযোগের বিষয়ে আবুল হাশেম বলেন, ‘চিনে নাই বলে হয়তো ওদের সহযোগিতা নিয়েছিল। আমি এস্টেট অফিসারকে বলে দিয়েছি, আমাদের লোকের বাইরে কাউকে হাসিল না তুলতে। আর দুই পক্ষকে ডেকে সমাধান করার পর হাসিল তোলার দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া হবে।’

চসিকে কত টাকা এখন পর্যন্ত হাসিল জমা হয়েছে সেটি জানতে চাইলে আবুল হাশেম এস্টেট শাখায় যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

চসিকের সহকারী এস্টেট অফিসার আবদুল্লাহ মামুনের কাছে জানতে চাইলে তিনিও কত টাকা হাসিল জমা হয়েছে সেটি জানাতে পারেননি। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের লোকেরাই হাসিল তুলছেন। প্রতি বাজারে ৫-৬ হাজার টাকা হাসিল উঠে। তবে কত টাকা জমা হলো সেটি ঠিক বলতে পারছি না।’

হাসিলের হিসাবটা পরে জানানো যাবে কিনা এমন প্রশ্নে আবদুল্লাহ মামুন বলেন, ‘আমি একা মানুষ। ওটা বের করতে সময় লাগবে।’

তবে আবুল হাশেম ও আবদুল্লাহ মামুন বিপলু ও হায়দার হাসিল তুলছেন না বলে জানালেও মঙ্গলবারও (১২ সেপ্টেম্বর) হায়দারকে হাসিল তুলতে দেখা গেছে। 

বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, হায়দার হাসিল তুলেছেন। তবে চসিকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পর তাঁরা এ বিষয়ে তৎপর হন।

স্থানীয় একজন দোকানি জানান, চসিকের একজন কর্মকর্তা হায়দারকে ফোন করে বাজার ছেড়ে চলে যেতে বলেন। এরপর দ্রুত হাসিল তুলে হায়দারের বাজার ত্যাগ করেন।

ইজারাদারকে হাসিল তুলতে না দেয়ার সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, অভিযোগটি যাচাই করা হবে।

আজকের সারাদেশ/১২সেপ্টেম্বর/এএইচ

সর্বশেষ সংবাদ