সন্ধ্যা ৭:১৪, সোমবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

টিকিট কালোবাজারিতে জড়িত রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য

সাইফুল আফ্রিদি, কক্সবাজার

কক্সবাজারের রেলযাত্রীরা টিকিট ভোগান্তিতে নেট দুনিয়া ফুঁসে উঠেছে। একদিকে রেল অপ্রতুল অন্য দিকে টিকিট সংকট। তার চেয়েও বড় সংকট কক্সবাজারের রেলের টিকিট এখন কালোবাজারীদের হাতে। চোখের পলকেই শেষ হয়ে যাচ্ছে টিকিট!ট্রেন চালুর এক সপ্তাহের মধ্যেই জেঁকে বসেছে কালাবাজারীরা! রেল স্টেশন ঘিরে গড়ে উঠছে নানান সিন্ডিকেট! এমন সব চোখ কপালে উঠা স্ট্যাটাস, কমেন্টের ঝড় উঠেছে নেটদুনিয়ায়। অনলাইন, অফলাইনেও চলছে তুমুল সমালোচনা। এভাবে চলতে থাকলে ট্রেনভ্রমন বিমুখ হবে যাত্রীরা। শীঘ্রই ব্যবস্থা না নিলে লোকসানের মুখে পড়তে পারে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ। এমন অহরহ প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে টিকিট কালোবাজারীর এক সিন্ডিকেটের। যে সিন্ডিকেটের মূলে কয়েক রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য ।

স্টেশনে গিয়ে দেখা মিলে, শনিবার সকালে আইকনিক রেলস্টেশনে আসতে শুরু করেছে যাত্রীরা। সাড়ে বারোটার ট্রেনে ঢাকা ফিরবেন তারা। যাদের আগে থেকেই টিকিট করা ছিলো তারা সানন্দে অপেক্ষা করছে স্টেশনে। তবে কাউন্টারে টিকিট নেই ঝুলানো নোটিশ দেখে বিরক্তভাবে এদিক সেদিক ঘুরছে অসংখ্য যাত্রী। টিকিট পেতে দায়িত্বরত অনেকের সাথে কথা বলছেন তারা। ফিরেও যাচ্ছেন অনেকে। টিকিট না পাওয়া এমন যাত্রীদের টার্গেট করছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) ইউনিফর্ম পরিহিত কয়েকজন সদস্য। টার্গেটের গা ঘেঁষে কথা বলছেন তারা। কথা শেষে আইকনিক স্টেশনের ভিতরে যাচ্ছেন একটুখানি পর ফিরে এসে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছেন রেলের টিকিট। রেল কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে টিকিট এনে দিচ্ছেন নিরাপত্তা কর্মীরা। এমন চিত্রটি গতকাল শনিবার ৮ ডিসেম্বর উঠে আসে প্রতিবেদকের ক্যামেরায়।

টিকিট না পেয়ে ঘুরতে থাকেন ঢাকাগামী এক ভদ্রলোক। পরে ওই নিরাপত্তাকর্মীকে টিকিটের কথা বলে ভদ্রলোকটি। কিছুক্ষণ অপেক্ষায় রেখে আরএনবি’র ওই সদস্য ভদ্রলোককে ব্যবস্থা করে দেয় ৪টি টিকিট। অনেকক্ষণ তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে থেকে কথা বলার সুযোগ হয় ঢাকাগামী ওই ভদ্রলোক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুনের সাথে। কাউন্টারে ঝুলানো নোটিশে ‘টিকিট নেই’ এর সময়ে টিকিট কিভাবে পেলেন জানতে চায়লে বলেন, এক লোক থেকে ৪টি টিকিট সংগ্রহ করেছি। এক নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ওই লোকের কাছে নিয়ে গেছে। ২৭ শ টাকা দিয়ে এই টিকিটগুলো কিনেছি। শুধু মামুন সাহেব নয় কথা হয় ছুটিতে বাড়ি যাওয়া রেলস্টেশনে অপেক্ষারত দুইজন সরকারি কর্মচারীর সাথে। তারাও জানান, বাড়তি দাম দিলে টিকিট দেওয়ার নিশ্চয়তা দেন  ওই আরএনবি সদস্য। তাই টিকিটের অপেক্ষায় আছি।

এবার যাত্রী সেজে কথা হয় কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সদস্য হেলাল নামের ওই আরএনবি সদস্যের সাথে। ঢাকা যাওয়ার  টিকিট চাইলে, প্রতিবেদককেও ২ টি টিকিট ২২ শ টাকা দিয়ে বিক্রির প্রস্তাব দেন তিনি। এছাড়াও আগামীকাল প্রতিবকের  কয়েকজন বন্ধু ঢাকা যাবে জানিয়ে  টিকিটের ব্যবস্থা হবে কি না জিজ্ঞেস করলে মুঠোফোন নাম্বারও দেন ওই আরএনবি সদস্য।

বিশ্বস্ত কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, শুধু হেলাল নয়  আরো কয়েক কর্মচারী মিলে এ সিন্ডিকেট গড়েছে। ভিড়িয়েছে বাইর থেকেও কয়েকজন।

এর আগে টিকিট কালোবাজারির বিষয়ে কক্সবাজারের জৈষ্ঠ্য সাংবাদিক তোফায়েল আহমদ ক্ষোভ ঝাড়েন সোশ্যাল মিডিয়ায়। তিনি লিখেন, ট্রেনের টিকেট যেন সোনার হরিণ। কাউন্টারে যথারীতি টিকেট নেই নোটিশ টাঙ্গানো রয়েছে।  কক্সবাজার আইকনিক স্টেশনে টিকেট প্রাপ্তি নিয়ে সাংঘাতিক রকমের এক অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। এখানে আসলেই চোখে পড়ে টিকেট নেই। অথচ কালোবাজারিদের কাছে ১৫০/২০০ টাকা বেশি দিলেই মিলে টিকেট। সরেজমিনে এমন তথ্যই মিলেছে বলে জানান সোশ্যাল মিডিয়ার এক স্ট্যাটাসে।

এদিকে যাত্রীদেরকে অতিরিক্ত ২ ঘন্টা অপেক্ষায় রেখে সাড়ে বারোটার ট্রেন ছেড়ে গেল বেলা ২ টা ২০ মিনিটের দিকে। এরপর কালোবাজারী টিকিট বিক্রির বিষয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে ফোনে কথা হয় ওই আরএনবি সদস্য হেলালের সাথে , প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পুরো বিষয়টি খোলে বললে অবাক এক পর্যায়ে স্বীকার করে প্রতিবেদকের সাথে দেখা করার জন্য হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। এরপর প্রতিবেদকের সাথে কথা বলতে নিজের ও নানান জনের মাধ্যমে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা  চালান তিনি।

টিকিটের বিষয়ে কথা হয় টিকিট কাউন্টারের সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হাসিবুলের সাথে। তিনি বলেন, প্রতিদিন অতিরিক্ত ১ হাজারের বেশি যাত্রী আসে। এখন ১৮ তারিখ পর্যন্ত টিকিট শেষ। ১৯ তারিখ বন্ধ। ২০ তারিখ থেকে টিকিট পাওয়া যাবে। আগামী পহেলা জানুয়ারি থেকে আরেকটি ট্রেন আসলে চাপটা কমে যাবে। এতটা চাপ এক ঘন্টায় সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। টিকিট  কালোবাজারির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে এত তাড়াতাড়ি কালোবাজারি কেমনে হবে! তবে রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট একটি পেইজের এক পোস্ট উল্লেখ করে জানতে চায়লে তিনি বলেন,  ট্রাভেল টিকিট পরীক্ষক(টিটিই) এর আগে কয়েকজনকে এনআইডি কার্ডের সাথে টিকিটের মিল না পাওয়ায় জরিমানা করেছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কক্সবাজারের সাধাধারণ সম্পাদক কলিমুল্লাহ বলেন, শুরু থেকেই  টিকিটের কালোবাজারি থামানো না গেলে কক্সবাজারের সুনাম মুখ থুবড়ে পড়বে। অনতিবিলম্বে কোন কর্মচারী যদি কালোবাজারির সাথে জড়িত থাকে তাদের ছাটাই করতে হবে কর্তৃপক্ষের।

শুরুতেই কালোবাজারীর হাতে টিকেট এমন কথা শোনে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, রেল ও স্থানীয় প্রশাসন মিলে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে অচিরেই এসব বন্ধ করা দরকার না হয় কক্সবাজারের সুনামের সাথে সরকারেরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে।

সচেতন মহল বলছে, বাইরে থেকে সিন্ডিকেট তৈরির আগেই রেলওয়ে কর্মচারীরা কালোবাজারি করছে। এটি সর্ষের মধ্যে ভূত লুকানো অবস্থা।  এটি তাড়াতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কি ব্যবস্থা নেয় সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কাউন্টারে টিকিট নেই নোটিশ ঝুলালেন কিন্তু রেলওয়ে কর্মচারীরা বাইরে টিকিট বিক্রি করছে। কি ব্যবস্থা নিবেন উল্লেখ করে স্টেশন মাস্টার গোলাম রাব্বানীর কাছে প্রশ্ন রাখলে তিনি বলেন, বাইরে টিকিট বিক্রি হচ্ছে এমন কোন ডকুমেন্টস থাকলে দিবেন। সাথে সাথে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিষয়টি নিয়ে জিএম (রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল) নাজমুল ইসলামের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন ধরেননি তিনি।

উল্লেখ্য যে, গত ১১ নভেম্বর  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন উদ্বোধন করেন। দেশের সবচেয়ে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন আইকনিক রেলস্টেশন ঘিরে মানুষের আগ্রহেরও শেষ নেই।

আজকের সারাদেশ/১০ডিসেম্বর/এএইচ

সর্বশেষ সংবাদ