রাত ৮:২০, সোমবার, ১০ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে ‘বুড়ো’ আওয়ামীলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী ‘শিশুদল’

সাইফুল আফ্রিদি:

মাঠে শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকলে কোন খেলা জমে উঠে না। তবে শক্তিমান ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনা কিংবা রিয়াল মাদ্রিদের প্রতিপক্ষ বার্সেলোনা এমন হলে তো কথায় নেই। বল মাঠে গড়ানোর আগেই উত্তেজনা মাঠে গড়ায়। ভক্তদের আলাপে তর্ক-বিতর্ক থাকে তুঙ্গে। কিন্তু খেলার প্রতিপক্ষ দুর্বল হলে সে খেলা আর জমে উঠে না।

কক্সবাজার জেলায় এবারের সংসদ নির্বাচনও হচ্ছে তেমনটায়। শক্তিমান আওয়ামীলীগের শক্ত প্রতিপক্ষ নেই মাঠে। ফলে ভোটের মাঠে যেমন গরম নেই তেমনি আমেজও নেই। ৭৩ বছর বয়সী আওয়ামীলীগের প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছে ১০/১৫ বছর বয়সী শিশুদল।

সর্বসাধারণের মন্তব্য, আওয়ামীলীগের চির প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি যেমন এই নির্বাচনে নেই তেমনি দুই দলে রাজনৈতিক প্রভাব রাখা দল জামায়াতও নেই। কল্যাণ পার্টি, বিএনএম নতুন গড়ে উঠা দলগুলোই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আওয়ামীলীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আলোচনায়ও আসছে সেসব দলের প্রার্থীরা। তবে অভিজ্ঞ ও জাঁদরেল বুড়ো বয়সী আওয়ামিলীগের তুলনায় এসব দল শিশুদলই।

গত ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মুহম্মদ শাহীন ইমরান। জেলার ৪ টি আসনে ২৪ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দলীয় প্রতীক। তবে সেসব প্রতীকে নৌকাই একমাত্র প্রতীক যেটি শিশু, বৃদ্ধ সবার পরিচিত। স্বাধীনতাত্তোর এই প্রতীক ছাড়া অন্য প্রতীকগুলো ভোটাররা চিনেও না। নামও জানে না দলের। জাতীয় পার্টির লাঙ্গল পরিচিত হলেও জায়গা করে নিতে পারেনি মানুষের মনে। ফলে নতুন নতুন প্রতীকের প্রতি নেই কারো আবেগও এমন অভিব্যক্তিই জানিয়েছেন কয়েক ভোটার।

প্রতীক বরাদ্দের পূর্বেই কক্সবাজার-১ আসনটি আওয়ামীলীগ প্রার্থী শূন্য হয়। ঋণখেলাপীর দায়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে আউট হয় নৌকার প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে টিকে যান সাবেক এমপি জাফর আলম। বিপরীতে জাফর বিরোধী আওয়ামীলীগ নেতারা কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র। এতে শুরুতেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

চকরিয়া-পেকুয়া আসনের শতাধিক ভোটারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আওয়ামীলীগের দলীয় প্রার্থী না থাকায় দলের নেতাকর্মীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। সালাহউদ্দিন সমর্থিত অংশটি কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করবে বলে জানা গেছে। জাফরের হাতে নির্যাতিত বিএনপি জামায়াতের কিছু অংশের ভোটও কল্যাণ পার্টির ঝুলিতে উঠতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই হিসেবে কল্যাণ পার্টি এগিয়ে থাকছে মাঠ জরিপে। এই আসনে ৭জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে এই দুইজন ছাড়া শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।

অন্যদিকে কক্সবাজার-২ ও কক্সবাজার-৩ আসনেও বড় ও শক্তিমান কোন দলের প্রার্থী নেই। বুড়ো আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ হিসেবে আছে ১০-১২ বছর বয়সী কয়েক শিশুদল। আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের তুলনায় এই দুই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর বয়সই শিশু সমতূল্য। ৭৩ বছর বয়সী রাজনৈতিক ইতিহাস সমৃদ্ধ আওয়ামীলীগের বিপরীতে ৮ বছর বয়সী তৃণমূল বিএনপি ১৬ বছর বয়সী শিশুদল কল্যাণ পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। নতুন হলেও এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এই দুইজনের নামই মোটামুটি সামনে আসছে আলোচনায়। রাজনৈতিক দলে সেসব দল এখনো পর্যন্ত শিশু দল হিসেবেই পরিচিত। দুই দলেরই ইতিপূর্বে সংসদীয় আসন লাভের কোন ইতিহাস নেই এই আসনগুলোতে।

সাধারণ ভোটারদের অধিকাংশ এমন নিত্যনতুন দলের নাম ও প্রার্থী দেখে বলছে এমন রাজনৈতিক দলের নাম, প্রার্থী ইতিপূর্বে শোনেনি তারা। তরুণ ভোটারসহ বয়স্ক লোকদেরও পরিচিত নয় এই প্রতীক ও দল। সেসব দলের রাজনৈতিকভাবে নেই কোন ইতিহাসও। চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে সাজন, রুবেল ও সাদেক বলছে, ভোট যুদ্ধ শুরুর আগেই চির প্রতিদ্বন্দ্বী নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে চলত আলোচনা, মিটিং, মিছিল। তবে গত দুয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে সেই প্রতিদ্বন্দ্বীতা দেখা নেই। স্লোগানে স্লোগানে শোনা যাচ্ছে না সেসব প্রতীকের নামও। সতীর্থ প্রতীক ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা মাঠে নেই, নৌকা প্রতীকের সেই আগের জৌলুসও নেই। নৌকার বিপরীতে যারা লড়ছে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক শক্ত অবস্থানও নেই কোন প্রার্থীর।

*কক্সবাজার-২ ও ৩ আসনে শিশুদলের সাথে লড়াই আওয়ামীলীগের

কক্সবাজার-২ আসনেও জাঁদরেল কোন প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নেই। এক সময়ের জামায়াত-বিএনপির হাতে থাকা এই আসনটিতে একে একে দুইবার এমপি নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামীলীগের মনোনীত আশেক উল্লাহ রফিক। তার বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে আছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুভমেন্ট দলের প্রার্থী শরীফ বাদশা। এছাড়া অন্যান্য ৪জন প্রার্থীদের রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে চিনেও না ভোটাররা। অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি)’র মাহাবুবুল আলম আম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান চেয়ার প্রতীকে, ইসলামী ঐক্যজোটের মো. ইউনুস মিনার প্রতীকে, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি- (বিএসপি)’র মোহাম্মদ খাইরুল আমিন একতারা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন। যাদের ৯০% ভোটাররা চিনেও না বলে জানিয়েছেন কয়েকজন ভোটার।

একইভাবে কক্সবাজার -৩ আসনে তিনবারের এমপি সাইমুম সরওয়ার কমলের বিপরীতেও নেই কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি, জামায়াত নির্বাচনে না আসাতে শক্ত কোন প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় এটিকেও নেকড়ের সাথে ভেড়ার পালের যুদ্ধ মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কল্যাণ পার্টির আব্দুল্লাহ আল মামুন কিছুটা আলোচনায় আসলেও কমলের শক্ত অবস্থান আর রাজনৈতিক প্রভাবে মাঠ ধরে রাখতে পারবেন কি না সেটি এখন জোরেশোরে আলোচনা চলছে।

এই আসনটিতে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে যারা রয়েছেন তাদের রাজনৈতিক দলের বয়সও শিশু সমতুল্য। জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক পরিচিত হলেও এই আসনে তোলপাড় সৃষ্টি করার মতো তাদের কোন প্রভাব নেই বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের কয়েকজন নেতা। নির্বাচন অফিসের প্রতীক বরাদ্দ সূত্রে জানা যায়, জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীক নিয়ে এড. মোঃ তারেক, হাতঘড়ি প্রতীকে কল্যাণ পার্টির আবদুল আওয়াল মামুন, টেলিভিশন প্রতিকে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফ্রন্ট মোহাম্মদ ইব্রাহিম ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)’র শামীম আহসান ভুলু কুঁড়েঘর প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর বয়স অনুসারে আওয়ামীলীগের তুলনায় এসব দলের বয়সও শিশু সমান। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে এই দুইটি আসনে আওয়ামীলীগের তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো শিশু দল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে ভোটারদের কাছে।

  • জাতীয় পার্টি আওয়ামীলীগের প্রতিপক্ষ

এই আসনটিতে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাব রয়েছে আব্দুর রহমান বদির পরিবারের। এবারে সেখানেই দ্বিতীয়বারের মতো নৌকা পেয়েছেন তার স্ত্রী শাহীন আক্তার। কক্সবাজার -৪ আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী শাহীন আক্তারের বিরুদ্ধেও নেই কোন শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে জাতীয় পার্টির নুরুল আমিন সিকদার ভুট্টো অন্যান্য আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তুলনায় কিছুটা শক্তভাবে অবস্থান নিতে পারেন এই আসনটিতে। এছাড়াও বাংলাদেশ কংগ্রেসের মো.ইসমাইল ডাব প্রতীকে, সোনালী আঁশ প্রতীকে তৃণমূল বিএনপির মুজিবুল হক মুজিব, মিনার প্রতীকে ইসলামী ঐক্যজোটের মোহাম্মদ ওসমান গনি চৌধুরী ও আম প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ফরিদ আলম।

একদিকে অপরিচিত দল অন্য দিকে অপরিচিত মুখের অচেনা প্রতীক। রাজনৈতিক ইতিহাস সচেতন কয়েকজন স্বাভাবিকভাবেই বলছে, যে সব দলের ৫২,৬৯,৭১ ও স্বৈরাচার আন্দোলনের ইতিহাস নেই সেসব দল কোন ইতিহাসই বা সৃষ্টি করবে! দেশের গণমানুষের কথা বলতে না পারলেই সেসব দলে মানুষের আস্থা থাকে না, আবেগ থাকে না, বিবেকও কাজ করেনা। ব্যাঙের ছাতার মতো গজানো দলগুলোর ইতিহাস তো দূরের কথা এখনো বয়সও হয়নি। যে দলের ইতিহাসে তরুণ বৃদ্ধ কারোরই আবেগ নাই সেসব দলকে মানুষ ভোট দিতে আগ্রহীও হবে না।

জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক ইতিহাস বাদ দিয়ে জেলার স্ব স্ব আসনেও ভোটারদের কাছে পরিচিত নয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থীরা। স্থানীয়রা বলছেন, আওয়ামীলীগের দুই তিনবারের শক্তিমান এমপিদের বিরুদ্ধে যারা মাঠে নেমেছে তাদের রাজনৈতিকভাবে শক্ত কোন অবস্থানই নেই।

তথ্য বলছে, কক্সবাজার জেলায় এবার যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের অনেক দলই এখনো শিশু বয়সের। যে কয়েকটি দলের জন্ম নব্বই-আশির দশকে সেসব দলেরও কোন প্রভাব এই অঞ্চলে নেই। প্রতিদ্বন্দ্বি দলগুলোর প্রতিষ্ঠাকালীন তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি গঠিত হয় (২০২৩), বিএনএম (২০২৩) কল্যাণ পার্টি (২০০৭), এনপিপি (২০০৭) বিএনএফ(২০১২) ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ(১৯৯০) ইসলামি ঐক্যজোট (১৯৯০), জাতীয় পার্টি (১৯৮৬), ন্যাপ (১৯৫৭), বাংলাদেশ কংগ্রেস(২০১৩), তৃণমূল বিএনপি(২০১৫),ওয়ার্কার্স পার্টি(১৯৮০), বাংলাদেশ ইসলামি ফ্রন্ট(১৯৯০)।

চির প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি (১৯৭৮) ও জামায়াত (১৯৭৯) সালে গঠিত হওয়া দল দুইটি ১৯৪৯ সালে গঠিত হওয়া আওয়ামীলীগের সাথে নির্বাচনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছিলো। তবে গত দুয়েকটি নির্বাচনে সেসব দল অংশগ্রহণ না করায় ভোটের মাঠের সেই জৌলুশও নেই বলে জানিয়েছেন বিএনপির এক সমর্থক।

আজকের সারাদেশ/একে

সর্বশেষ সংবাদ