সকাল ৭:৪১, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ: সড়ক থেকে খাবার হোটেল সর্বত্র হাহাকার

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:
বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে গ্যাস সরবারহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামে। এতে বাসাবাড়ী থেকে শুরু করে কলকারখানা, খাবার হোটেল ও ফিলিং স্টেশনে দেখা দিয়েছে চরম দুর্ভোগ। নগরীর অধিকাংশ পরিবারে চুলা জ্বলেনি শুক্রবার, সপ্তাহিক ছুটিরদিনে বন্ধ থাকায় অধিকাংশ বাণিজ্যিক কারখানায় খুব একটা প্রভাব পড়েনি, তবে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে সচল কারখানায়৷ বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের সামনে এলএনজির জন্য যানবাহন নিয়ে বৃহস্পতিবার রাত থেকে অপেক্ষায় ছিলেন হাজার হাজার চালক। নির্ঘুম রাতের পর শুক্রবার সকালে হতাশ হয়ে ফিলিং স্টেশনেই গাড়ি রেখে বাসায় ফিরেছেন অনেকে। নগরজুড়ে বিভিন্ন খাবার হোটেলের সামনেও দেখা গেছে দীর্ঘ সারি।

চট্টগ্রামে প্রায় ৬ লাখ গ্রাহককে গ্যাস সরবরাহ করে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। গ্রাহকদের দাবি কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি বা পূর্ব ঘোষণা না দিয়েই গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ বলছে এমন সংকট আকস্মিক।

হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধে চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। নগরীর নাছিরাবাদ এলাকার বাসিন্দা মুজতাহিদ হাসান শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে বলেন, ‘সকালে উঠে দেখি গ্যাস নেই। ভেবেছিলাম পরে স্বাভাবিক হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত স্বাভাবিক হয়নি। তাই রান্নাও হয়নি আমাদের৷ এমন পরিস্থিতিতে আমরা প্রতিবেশী থেকে একটি গ্যাস সিলিন্ডার নিয়ে রান্নার চেষ্টা করছি এখন।’

নগরীর চান্দগাঁও থানার বাদুড়তলা এলাকার বাসিন্দা খাইরুন রুমি বলেন, ‘গতকাল রাত থেকে গ্যাস নেই। এক কাপ চা দেওয়ারও সুযোগ নেই৷ এভাবে না জানিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিয়েছে, অথচ কেউই কিছু বলছে না। আমরা সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়ে কেউই চিন্তা করে না।’

নগরীর ইপিজেড এলাকার বাসিন্দা ইসরাত জাহান পান্না বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় রান্না হয়নি। আমরা ছোট বাচ্চাটাও না খেয়ে ঘুমিয়ে আছে। একটা বৈদ্যুতিক চুলা কিনেছি, একটা সমস্যার কারণে সেটাও কাজ করছে না।’

এদিকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় নগরীর অধিকাংশ খাবার হোটেলেও রান্না হয়নি। তবে কিছু কিছু হোটেল রেস্তোরাঁয় রান্না হয়েছে এলএনজি সিলিন্ডারের মাধ্যমে। সেসব হোটেল রেস্তোরাঁর সামনে দেখা গেছে সাধারণ মানুষের দীর্ঘ সারি। নগরীর দুই নম্বর গেইট এলাকায় সেভেন ডেইজ রেস্তোরাঁ থেকে লাইনে দাড়িয়ে পরিবারের সবার জন্য খাবার খাবার নেন ওই এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি স্ত্রী আর এক সন্তান নিয়ে থাকি আলফালাহ গলিতে, আজ গ্যাস না থাকায় সবাই হুমড়ী খেয়ে পড়েছে। প্রায় ৩০ মিনিট দাড়িয়ে তিনজনের জন্য খাবার কিনলাম।’

গ্যাস সংকটের কারণে রাত থেকেই ফিলিং স্টেশনগুলোতেও বন্ধ ছিল এলএনজি সরবারহ। তাই চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের অপেক্ষায় ছিল কয়েক হাজার যানবাহন। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা শামসুদ্দিন মুহাম্মদ হাসান বলেন, ‘আমি জরুরী কাজে চট্টগ্রাম শহরে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে আমাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের গ্যাস শেষ হয়ে গেলে রাত ১১ টার দিকে একটি ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নেওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু গ্যাস না থাকায় সারারাত অপেক্ষা করেও নিতে পারিনি। পরে ফিলিং স্টেশনে মাইক্রোবাস রেখেই সিএনজি অটোরিকশা যোগে বাড়ি ফিরতে হয়েছে ভোরে।’

শুক্রবার বিকেলে নগরীর অক্সিজেন জালালাবাদ ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের জন্য নিজের চালিত লেগুনা নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন আব্দুর রহীম। তিনি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, গাড়ি চালিয়ে কোনোমতে চলি৷ কিন্তু আজ সকাল থেকে অপেক্ষা করছি। কোথাও গ্যাস নেই, অথচ গাড়ি না চললে আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে।’

শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় যাত্রী ও গণপরিবহনের চাপ কম চট্টগ্রামে। তবে এরমধ্যেও এলএনজি নিতে না পারায় বন্ধ অধিকাংশ যানবাহন। এই সুযোগ অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছেন যানবাহন চালকরা। চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় এলাকার বাসিন্দা ফাহাদ বিন হাসান বলেন, ‘বিকেল তিনটার দিকে জরুরি কাজে আমি অক্সিজেন থেকে আতুরার ডিপো এলাকায় যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বপর হয়ে অবাক হয়ে যায়। সড়কে তেমন কোনো গাড়িই নেই৷ আমরা বেশ কিছুক্ষণ দাড়িয়ে একটা গাড়ি পেয়েছি, তাও দ্বিগুণ ভাড়া দিতে হয়েছে।’

বোয়ালখালীর বাসিন্দা গণমাধ্যমকর্মী পূজন সেন বলেন, ‘আমি পূর্ব কালুরঘাট থেকে গোমদণ্ডী গিয়েছি ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে৷ অথচ সাধারণত এই পথটুকুর ভাড়া ৫ টাকা। যেহেতু সড়কে গাড়ি কম, তাই বাধ্য হয়ে যেতে হয়েছে।’

শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় নগরীর অধিকাংশ শিল্প কারখানাই বন্ধ। তবে কিছু কিছু কারখানা খোলা থাকলেও গ্যাস না থাকায় বন্ধ ছিল কার্যক্রম। এই বিষয়ে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সহ-সভাপতি ও আর ডি এম গ্রুপের চেয়ারম্যান রকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আজ ছুটিরদিন হওয়ায় খুব একটা সমস্যা হয়নি। যাদের প্রতিষ্ঠান খোলা আছে, তাদের হয়ত সমস্যা হচ্ছে। তবে আমরা এখনও এরকম কোনো তথ্য পাইনি। তবে কালও মোটামুটি সব প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে, কালও যদি একই সমস্যা থাকে তাহলে সবাই চরম দুর্ভোগে পড়বে।’

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে চাহিদার সিংহভাগ গ্যাসের যোগান হয় আমদানির মাধ্যমে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে আমদানি করা এসব গ্যাস কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান দুটি টার্মিনাল থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। তাদের একটির নির্মাতা মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি, অন্যটি নির্মাণ করেছে সামিট গ্রুপ।

কেজিডিসিএল বলছে, দুই টার্মিনালের মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি ১ নভেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে। ওই টার্মিনালটি বিচ্ছিন্ন করে সেসময় সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়েছি সংস্কারের জন্য। আরও আগে টার্মিনালটি দেশে আসার কথা থাকলেও সেটি আসে কয়েকদিন আগে। গতকাল এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি গ্যাস সরবরাহের জন্য যুক্ত করার পর সামিটের টার্মিনালটি খুলে নেওয়া হয়। সংস্কারের জন্য সেটিরও সিঙ্গাপুর পাঠানোর কথা রয়েছে। এরমধ্যে সরবরাহ চালুর পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। আর এতে এই টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।

এই বিষয়ে কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) প্রকৌশলী আমিনুর রহমান বলেন, ‘মূলত সিঙ্গাপুর থেকে আনার পর টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবারহের জন্য যুক্ত করা হয়। কিন্তু এটাতে কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এরমধ্যে অন্যটি সিঙ্গাপুর পাঠানের জন্য খুলে নেওয়া হয়। এমন সমস্যা হবে আমরা জানতাম না, তাই গ্রাহকদের আমরা আগে থেকে জানাতে পারিনি।’

শনিবারের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞ টিম এসেছে। আশা করছি আগামীকালের মধ্যে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে যাবে।’

ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি যেন না হয় সে বিষয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার কথাও জানান তিনি।

কেজিডিসিএল সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানটির মোট গ্রাহক সংযোগ রয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৯১৪ টি। এরমধ্যে ৫ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ টি গৃহস্থালি সংযোগ ও বাকীগুলো বাণিজ্যিক। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা থেকে ৩২৫ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে চাহিদার পুরোটায় সরবারহ পাওয়া যায়। তবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালটি বন্ধ থাকার সময় চট্টগ্রামে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ ছিল ৩০০ ঘনফুট।

আজকের সারাদেশ/১৯জানুয়ারী/এএইচ