সকাল ৬:৪৪, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

‘আমার আব্বু মরেনি, আব্বুকে ছাড়া যাব না’

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

অদূরেই আনোয়ার পারভেজের নিথর-নিস্তব্দ দেহটা পড়ে আছে সড়কে। পুরো শরীরে চোপ চোপ রক্তের দাগ। সেই রক্তে ভিজে গেছে আশপাশও। তবুও বাবা যে আর বেঁচে নেই সেটি মানতে চায় না ছোট্ট আবু সায়েমের মন। কীভাবেই বা মানবে? ভোরে যে বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সায়েম মাদ্রাসায় গিয়েছিল, সেই বাবাই কিছুক্ষণের মধ্যে চিরদিনের জন্য নেই হয়ে যাবে-মানবে কি করে?

তাই তো ১০ বছরের আবু সায়েম চাচাদের দিকে তাকিয়ে বারবার বিলাপ করছিল, ‘আমার আব্বু মরেনি। আমার আব্বুর কিচ্ছু হয়নি। আমার আব্বুকে রাস্তা থেকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যাই চল। আমি আব্বুকে ছাড়া যাব না।’

বাবা হারানোর দুঃখে কাতর ভাতিজাকে জড়িয়ে ধরে চোখ মোছেন চাচা আনোয়ার সাদেক। কোথায় সায়েমকে সান্ত্বনা দেবেন, ভাই হারানোর ব্যথায় সাদেক নিজেই যে ডুবে আছেন দুঃখের সাগরে! সেই দুঃখ কিছুটা প্রশমিত হতেই সাদেক শোনালেন আরও দুঃখজাগানীয়া কথা। বললেন, ‘আমার ভাইয়ের তিনটি ছোট ছোট বাচ্চাকে কী বলে সান্ত্বনা দেব আমরা। এক নিমিশেই তো আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।’

আনোয়ার পারভেজ ছিলেন কোরীয় রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলে (কেইপিজেড) কর্ণফুলী শুজ ইন্ডাস্ট্রি (কেএসআই) নামের একটি কারখানার নিরাপত্তাকর্মী। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার (৩০ জানুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল সংযোগ সড়কের আনোয়ারা প্রান্তে ট্রাকচাপায় নিহত হন সাইকেল আরোহী আনোয়ার।

মঙ্গলবার সকালে ঘটনাস্থলে দেখা যায়, সড়কের পাশে পড়ে আছে আনোয়ার হোসেনের মরদেহ। সেই মরদেহের ওপরেই পড়ে আছে ভেঙে যাওয়া সাইকেলটি। টিফিন বাক্স ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে সড়কের এখানে ওখানে। মূহূর্তেই মালিকশূন্য হয়ে যাওয়া জুড়া জোড়াও পড়ে আছে অদূরে। বাবার মৃত্যুর খবর শুনে চাচাদের সঙ্গে সেখানে ছুটে আসে আনোয়ার পারভেজের বড় ছেলে আবু সায়েম। আর বাবাকে রক্তেভেজা পড়ে থাকতে দেখে আহাজারি করে সবাইকে অনুরোধ করছিল, বাবাকে নিয়ে হাসপাতালে চল।

৪৫ বছরের আনোয়ার পারভেজ আনোয়ারা উপজেলার পরৈকোড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ছৈয়দ আহমেদের ছেলে। তিন সহকর্মী সাইকেল চালিয়ে চাতরি চৌমুহনী থেকে কেইপিজেডের দিকে যাচ্ছিলেন। টানেলের সংযোগ সড়কের এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করার পর পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ট্রাক আনোয়ার পারভেজকে চাপা দিয়ে চলে যায়। চোখের সামনেই আনোয়ার পারভেজের মৃত্যু দেখে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি আরেক নিরাপত্তাকর্মী নাজিম উদ্দীন। সেই মুহূর্তটি যেন এখনো তাঁর চোখের সামনে ভাসছে। বলছিলেন, ‘আমি ছিলাম সামনে। হঠাৎ পেছনে একটা আওয়াজ শুনি তাকিয়ে দেখি সাইকেলসহ আনোয়ার পড়ে আছে সড়কে, আর দ্রুতগতিতে পালিয়ে যাচ্ছে ট্রাকটি।এভাবে একজন সহকর্মীকে হারিয়ে ফেলব-মনকে কোনোভাবেই সান্ত্বনা দিতে পারছি না।’

আনোয়ার পারভেজকে মেরে পালিয়ে যাওয়া ট্রাকটিকে এখনো জব্দ করা যায়নি। তবে টানেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোহেল আহমেদ।

হয়তো খুব দ্রুতই ধরা পড়বে ট্রাকটি, বিচার হবে ট্রাক চালকেরও। শুধু হবে না একটা জিনিস! ছোট্ট আবু সায়েমের বাবা আর কখনো কাজ শেষে ফিরে আদর করে বলবে না, ‘বাবা কেমন আছিস, ভাত খেয়েছিস।’

আজকের সারাদেশ/৩০জানুয়ারী/টিএইচ/এএইচ