ভোর ৫:৩৬, সোমবার, ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যে খুনের গল্প সিনেমাকেও হার মানায়!

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

চট্টগ্রামে শুধুমাত্র একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে যেভাবে ফাঁদে ফেলে ফটোগ্রাফার শাওন বড়ুয়াকে খুন করা হয়েছে তাতে বিস্মিত হয়েছেন পুলিশ সদস্যরাও। ওই কলেজছাত্রকে খুনের ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডের পুরো রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। সেই খুনের গল্প যেন সিনেমাকেও হার মানিয়েছে। বুধবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (উত্তর) পঙ্কজ দত্ত চান্দগাঁও থানায় এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে ঘটনার পুরোটা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নগরের চাদগাঁও থানার বাহির সিগন্যাল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আশহাদুল ইসলাম ইমন ও মো. তৌহিদুল আলম এক সময় অন্যজনের সহকারী হিসেবে বিভিন্ন বিয়ে অনুষ্ঠানে ছবি তোলার কাজ করতেন। তাদের কাছে কোনো ডিএসএলআর ক্যামেরা ছিল না। সেজন্য একটি ক্যামেরার শখ জাগে তাদের। বিষয়টি তারা এলাকার বড় ভাই মো. বাহারকে জানান। বাহারসহ মিলে এরপর ক্যামেরা ছিনতাইয়ের ফন্দি আঁটেন। সেই পরিকল্পনায় তাঁরা যুক্ত করেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক মো. আলমগীর ও মো. ইমতিয়াজ আলম মুরাদ নামে আরও দুইজনকে। শুরুতে পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ফটোগ্রাফিতে যুক্ত এমন বেশ কয়েকটি ফেসবুক পেজে যোগাযোগের সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে উচ্ছ্বাস বড়ুয়া নামের একটি ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে তারা সোমবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে একটি বিয়েতে ছবি তোলার বিষয়ে কথা বলেন। তবে ওই পেজ থেকে জানানো হয় তারা এখন ফটোগ্রাফি করেন না, সেখান থেকে জনি বড়ুয়া নামের এক ফটোগ্রাফারের মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়। তবে জনি বড়ুয়ার অন্য কাজ থাকায় তিনি শাওন বড়ুয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজটি করবেন কিনা জানান। শাওন রাজি হলে ইমন-তৌহিদুলের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেন জনি। এরই মধ্যে বিশ্বাস স্থাপন করতে মোবাইল আর্থিক লেনদেন সেবা-বিকাশে অগ্রিম ৫০০ টাকাও পাঠান ইমন-তৌহিদুল।

পুলিশ কর্মকর্তা পঙ্কজ দত্ত আরও বলেন, ‘পরিকল্পনা অনুযায়ী ইমন ও তৌহিদুল সোমবার রাত ৮টা ২৫মিনিটের দিকে ফোন করে শাওনকে জানান তাঁকে ‘রিসিভ’ করতে মুরাদ নামের এক ছোট ভাই বাহির সিগন্যালের বেপারি পাড়ার ভাঙা পুলের মাথায় অপেক্ষা করছেন। পরে শাওন মোটরসাইকেল চালিয়ে ওই এলাকায় আসেন। এরপর মুরাদকে নিজের মোটরসাইকেলের পেছনে বসান শাওন। এ সময় মুরাদ শাওনকে জানান বিয়ের অনুষ্ঠানটা অনান্য আবাসিক এলাকা হয়ে যেতে হবে। সে অনুযায়ী শাওন গাড়ি চালাচ্ছিলেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সিএনজি অটোরিকশাচালক আলমগীর গাড়িতে করে ইমন, তৌহিদুলকে নিয়ে তাঁদের পেছনে পেছনে যেতে থাকেন। তবে এক পর্যায়ে ফাঁদে পড়েছেন বিষয়টি আঁচ করতে পেরে শাওন দ্রুত গাড়ি চালিয়ে অনান্য আবাসিকের দিকে চলে যান। এক পর্যায়ে পকেট থেকে ছুরি বের করে মুরাদ বলে উঠেন, ‘কোনো বিয়ের অনুষ্ঠান নেই, ভালোমতো ক্যামরাসহ ব্যাগটা দিয়ে দাও।’ এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তিও হয়। পরে গাড়ি থামিয়ে মুরাদকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে চান। এর মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে মুরাদ মাটিতে লুটিয়ে পড়লে শাওন তাঁকে ধাক্কা দিয়ে চলে যেতে চান। সুযোগ বুঝে মুরাদ শুরুতে শাওনের উঁরুতে ছুরিকাঘাত করেন। আহত অবস্থায় শাওন কুড়িয়ে কুড়িয়ে চলে যেতে চাইলে মুরাদ মাটি থেকে উঠে শাওনের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আরও ছয়টি ছুরিকাঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। এরপর বাহারকে ফোন দিয়ে শাওনকে মেরে ফেলার বিষয়টি জানালে তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। পরে শাওনের ক্যামেরাসহ ব্যাগটি নিয়ে মুরাদসহ দুজনেই পালিয়ে যান। পরদিন মঙ্গলবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকালে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ শাওনের রক্তাত্ব মরদেহ উদ্ধার করে। এরপরই ঘটনার কারণ বের করতে মাঠে নেমে পড়ে পুলিশের একটি দল।

অভিযানে অংশ নেওয়া চান্দগাঁও থানার দুজন উপপরিদর্শক (এসআই) বলেন, ‘হত্যার পর ক্যামেরা নিয়ে পালিয়ে গেলেও শাওনের মুঠোফোনটি নিয়ে যায়নি হত্যাকারীরা। সেই মুঠোফোনই খুনি ও পরিকল্পনাকারীদের খোঁজ পাওয়ার কাজটি সহজ করে দেয়। প্রথমে আমরা জনি বড়ুয়াকে হেফাজতে নিই। তাঁর মাধ্যমে যে নম্বর থেকে বিকাশ করা হয় সেটি বের করি। পরে বিকাশের দোকানে গিয়ে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বের করে বিকাশে টাকা পাঠানো ইমন ও তৌহিদুলকে শনাক্ত করি। এরপর অভিযান চালিয়ে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেফতার করি।’ তবে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় জনিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

এই হত্যাকাণ্ডকে ‘বিরলতম’ বলেও মনে করছেন এই দুই পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁরা বলেন, ‘বহু সিনেমা এবং ওয়েব সিরিজ তৈরি হয়েছে হত্যার সত্য ঘটনা অবলম্বনে। আবার অনেক খুনের ঘটনা রয়েছে, যেগুলোর অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছে সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ। তবে শাওন বড়ুয়াকে হত্যার ঘটনায় হত্যাকারীরা কোনো সিনেমা বা ওয়েব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন কিনা এখনো নিশ্চিত হইনি। তবে এটা ঠিক যেভাবে হত্যা করা হয়েছে সেটি সিনেমাতেই বেশি দেখা যায়।’

আজকের সারাদেশ/একে