সকাল ৬:১৭, শুক্রবার, ১০ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

পোল্ট্রি শিল্প: কর্পোরেট থাবায় নিঃস্ব খামারিরা

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

প্রায় এক যুগ আগে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া ২০ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে পোল্ট্রি মুরগির খামার শুরু করেছিলেন ফটিকছড়ির নিচিন্তা এলাকার বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম। শুরুর ৮-১০ বছর ভালোই চলছিল খামার। তখনকার মুনাফা দিয়ে খামারের পরিসর বড় করেন তিনি। পাশাপাশি ব্যয় নির্বাহ হত পরিবারের। তবে গেল ৩-৪ বছরে টানা লোকসানে আছেন জাহাঙ্গীর। এই সময়ে তাঁর খামারের পরিসর কমেছে, ঋণ হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকার মত। এরমধ্যে সময়মত টাকা পরিশোধ করতে না পেরে  হারিয়েছেন বন্ধক রাখা জমিও। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘মুরগির বাচ্চা ও খাবারের  দাম বেশি এখন। আমরা যখন শুরু করেছি তখন বাচ্চার দাম ছিল ১৫-১৬ টাকা, খাবারের দাম ছিল ১২-১৩’শ টাকা। এখন মুরগীর বাচ্চা ৬০ টাকার বেশি, খাবার ৩৬’শ টাকা। আমাদের গ্রামে ১০ জন খামারি ছিল আমার মতো, তাদের মধ্যে ৯ জন নিঃস্ব হয়ে গেছে। আমি কোনোমতে টিকে আছি এখনও।’

অনেকটা একই রকম অবস্থা উপজেলার কেঁওচিয়া এলাকার মো. শাহাজাহানের। তিনি জানান, ১০-১২ বছর আগে ২০ বছর চাকরি জীবনের সঞ্চয় নিয়ে খামার শুরু করেছিলেন। শুরুতে মুনাফার টাকা দিয়ে ৩-৪ টা খামার করেন। কিন্তু গেল কয়েক বছরে টানা লোকসানে পড়েন তিনিও। তিনি বলেন, ‘এখন মাত্র একটা খামার আছে। তাছাড়া মূলধন হারিয়ে এখন আমার পাঁচ লাখ টাকা ঋণ। আমাদের সবার লসের পেছনে দায়ী হ্যাচারিগুলো, তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আামদের এলাকায় আমার মত অনেকইে নিঃস্ব হয়ে গেছে।’

শুধু জাহাঙ্গীর আর শাহাজাহান নন, বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোল্ট্রি এসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী চট্টগ্রামে ৪০ হাজার  পোল্ট্রি মুরগি খামারীর মধ্যে ৯০ শতাংশই বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্থ। নিঃস্ব হয়ে খামার গুটিয়ে নিয়েছেন হাজার হাজার খামারি। প্রান্তিক খামারিদের এমন দুরবস্থার পেছনে বড় বড় হ্যাচারিগুলো দায়ি বলে দাবি সরকারের  প্রাণি সম্পদ বিভাগ, খামারি ও ডিলারদের।

চট্টগ্রামের পটিয়ায় মুরগির বাচ্চা ও খাবারের ডিলার শ্যামল মিত্র বলেন, আমার এখান থেকে বাচ্চা ও খাবার নেয় এমন ৭০ জনের মত খামারি আছেন। এখন তাদের মধ্যে ৬০-৬৩ জনের মতো নিঃস্ব, ঋণে জর্জরিত। এই সেক্টরটা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোই দায়ী। তাদের কেউ কেউ কন্ট্রক্ট ফার্মিং করতেছে। কেউ কেউ আবার সরাসরি নিজেরাই ফার্মিংয়ে যাচ্ছে। এতে খামারি আর তাদের উৎপাদন ব্যয়ে বিশাল তারতম্য হয়।’

ফটিকছড়ির দাঁতমারা এলাকার ডিলার মো. ইদ্রীস বলেন, ‘সরকার মুরগির বাচ্চার দাম বেঁধে দিয়েছে ৪৯ টাকা। কিন্তু হ্যাচারিগুলো আমাদের বাচ্চা দিচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা দরে। তারা আবার কোনো প্রমাণও রাখে না। আমাদের মেমোও দেয় না। কোনো প্রতিবাদ করলে বাচ্চাও দেয় না।’

বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোল্ট্রি এসোসিয়েশনের নেতারা জানান, বর্তমানে অধিকাংশ বড় বড় হ্যাচারি অধিক মুনাফার জন্য সরাসরি মুরগি লালন পালন ও কন্ট্রাক্ট ফার্মিংয়ে (পছন্দের খামারিকে চুক্তি ভিত্তিক কম দামে বাচ্চা ও খাবার সরবারহ) যাচ্ছে। তাদের বড় খামার, আবার তারা প্রযুক্তিও ব্যবহার করে। তাতে তাদের উৎপাদন ভালো হয়। এরমধ্যে তারা নিজেদের মুরগীর বাচ্চা দিয়ে ফার্মিং করে, এতে তাদের ব্যয়ও কম হয়। অর্থাৎ একটা  বাচ্চার উৎপাদন খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা, এই খরচেই তারা সরাসরি লালন পালন শুরু করে। আবার মুরগীর খাবার ও ওষুধেও তাদের খরচ কম। কারণ তারা নিজেরাই এসব উৎপাদন করে। কিন্তু যারা প্রান্তিক খামারি, বর্তমানে তাদের হাতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি বাচ্চার দাম পড়ে ৬০ টাকা। খাবার ও ওষুধের দামও তুলনামূলক বেশি দিতে হয় তাদের।  এতে তাদের উৎপাদন ব্যয় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর চেয়ে অনেক বেশি পড়ে। এসব মুরগী বাজারজাত করার সময় একই মূল্যে বাজারজাত করতে হয়। এতে হ্যাচারিমালিকরা লাভবনা হলেও লোকসানে পড়ছেন প্রান্তিক খামারিরা।

বৃহত্তর চট্টগ্রাম পোল্ট্রি এসোসিয়েশনের সভাপতি রিটন চৌধুরী বলেন, ‘কর্পোরেট প্রতিষ্টানগুলো এই শিল্পটাকে ধ্বংস করে পুরোটাই নিজেদের কব্জায় নেওয়ার চেষ্টা করছে। এই শিল্পটাকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। কারণ প্রান্তিক খামারিদের প্রতিটা খামারের মাধ্যমে অনেকগুলো পরিবার চলে। তারা এখন নিঃস্ব, ঋণে জর্জরিত।’

তিনি বলেন, ‘একটা মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের ক্ষেত্রে হ্যাচারির খরচ হয় ৩০-৩৫ টাকা, কিন্তু তারা খামারিদের বাচ্চা দিচ্ছে ৫৫-৬০ টাকা করে। খাবারের উৎপাদন খরচ একটু বাড়লেই দাম বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ, কিন্তু উৎপাদন খরচ কমলে দাম কমায় না। আবার বাজারে মুরগীর দাম একটু বাড়লেই বাচ্চার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, নিজেদের কন্ট্রাক্টে থাকা ফার্মে বাচ্চা সরবারহ করে, নিজেরাও লালন পালন করে। এতে মুনাফার সিজনে বঞ্চিত হয় প্রান্তিক খামারিরা।’

গেল কয়েকমাস ধরে মুরগীর বাচ্চার কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে হ্যাচারিমালিকরা। আগামি কয়েক মাসের মধ্যে এর প্রভাবে দেশের বাজারে মুরগীর বাজার আরো অস্থিতিশীল হতে পারে বলে দাবি তার।

অনেকটা একই কথা বললেন চট্টগ্রাম জেলা প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. নজরুল ইসলামও। তিনি বলেন, ‘প্রান্তিক খামারিদের দুরবস্থার পেছনে বড় বড় খামারিগুলোই দায়ি। এর পেছনে হ্যাচারি মালিকদের কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও নিজস্ব ফার্মিং মূল কারণ। মুরগীর দাম বাড়লেই তারা বাচ্চার সরবারহ কমিয়ে দেয়। সব মিলিয়ে প্রান্তিক খামারিরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এটা নিয়ে আমরা কাজ করছি, সরকারের বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করছে।’

দেশে মুরগীর বাচ্চা উৎপাদনকারি হ্যাচারি মালিকদের ‘ব্রিডার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ নামের একটি সংগঠন রয়েছে। প্রান্তিক খামারি, ডিলার ও প্রাণি সম্পদ কর্মকর্তার অভিযোগের বিষয়ে জানতে ওই সংগঠনের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আজকের সারাদেশ/এএইচ

সর্বশেষ সংবাদ

৫ কোটি টাকার পার্ক কাজে লেগেছে মাত্র ১ দিন, ১২ কোটি টাকায় ফের সংস্কার

বেনজিরের ‘বেনজির’ সম্পত্তি জব্দের নির্দেশ

উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে অনড় কুবি শিক্ষক সমিতি

এমপি আজীম হত্যাকাণ্ডে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে: শাহীন

প্রথমবারের মতো আন্ডারপাস নির্মাণের উদ্যোগ নিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন

কোরবানির বাজার: খাতুনগঞ্জে দেশি পেঁয়াজের রাজত্ব

চট্টগ্রামে বুদ্ধ পূর্ণিমায় মানুষের মুক্তি কামনায় প্রার্থনা

চট্টগ্রাম বোর্ড: সচিবকে আটকাতে কর্মচারীদের ব্যবহার চেয়ারম্যানের!

ফেসবুক খুঁজে দিল ৩০ বছর আগে হারিয়ে ফেলা তিন বান্ধবীকে

ভারতে চিকিৎসা নিতে গিয়ে খুন হলেন বাংলাদেশের এমপি আনোয়ারুল আজিম