রাত ১:১৭, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

এলাচের বার্ষিক চাহিদা ৮ হাজার টন, প্রতিদিন কাগজেই বিক্রি হচ্ছে হাজার টন

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

বাংলাদেশে মসলাপণ্য এলাচের বার্ষিক চাহিদা ৮ হাজার টনেরও কম বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে প্রতিদিন ১ হাজার টন এলাচ বিক্রি হচ্ছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, কাগজে-কলমে এলাচের এমন বিক্রির ফলে অস্থির হয়ে উঠেছে বাজার। খাতুনগঞ্জে দশকের পর দশক ধরে ডিও (পণ্যের বিপরীতে ডেলিভারি অর্ডার স্লিপ) কেনাবেচার প্রচলন রয়েছে। ঈদুল আজহার আগে মসলার বাজারের ডিও বিক্রি হচ্ছে বেশি।

বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, “দেশে বছরে এলাচের চাহিদা সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৬০০ টন। অথচ চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারেই প্রতিদিন হাজার টনের বেশি এলাচ ট্রেডিং হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছেন মসলা আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা।”

এলাচের ক্ষেত্রে ডিও ট্রেডিংয়ের মধ্যমে সাথে সাথে এলাচের ডেলিভারি না নিয়ে ভবিষ্যতে নেওয়ার জন্য মসলাটির কেনা-বেচার চুক্তি করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা স্বল্প সময়ে পণ্যটির মূল্য ওঠানামা থেকে মুনাফা অর্জনের লোভে প্রায়ই বড় অঙ্কের চুক্তিতে যান। তাদের এই কারসাজিতে অস্থির হয়ে ওঠে এলাচের বাজার। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ই।

খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সেকান্দার হোসেন বলেন, “এটা এক ধরনের জুয়া খেলার মতো। যেখানে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা পণ্যের ডিও বা স্লিপ বিক্রি হয়। কিন্তু ক্রেতা-বিক্রেতারা জানেন না এই পণ্য কোথায়। এই ডিও বেচাকেনায় কোনো একটি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ হয়ে হঠাৎ বড় দরপতন হয়। তখন ডিও বা স্লিপগুলো যাদের হাতে থাকে, তারা বড় লোকসানে পড়ে মার্কেট থেকে উধাও হয়ে যান।”

এক হাত থেকে আরেক হাতে ডিও বেচাকেনার মাধ্যমে ভোগ্যপণ্যের বাজার খাতুনগঞ্জে গত দুইমাসে এলাচের দাম বেড়ে বর্তমানে প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৯০০ টাকায়। অথচ বাজারে বিক্রি হওয়া এসব এলাচ আমদানি করতে প্রতিকেজিতে খরচ পড়েছে ১,২০০-১,৫০০ টাকা।

খাতুনগঞ্জের প্রকৃত মসলা ব্যবসায়ীরা জানান, বর্তমানে বাজারে প্রতিকেজি এলএমজি (২০২৩-২৭) এলাচ ৩,৯০০ টাকা এবং এলএমজি (২০২৪-২৮) ৩,৪৫০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। অথচ একই সাপ্লাইয়ার (কারডেক্স) থেকে আমদানি করা একই পণ্য ঢাকার বাজারে এলএমজি (২৩-২৭) ৩,০০০ টাকা এবং এলএমজি(২৪-২৮) ২,৯৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শুধুমাত্র লোকাল ট্রেডিং বা স্থানীয় বাজারে এক ব্যবসায়ী থেকে আরেক ব্যবসায়ীর হাত বদলের কারণে ঢাকার বাজার থেকে চট্টগ্রামের বাজারে একই পণ্য কেজিতে ৫০০-৯০০ টাকার ব্যবধানে বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তারা।

পণ্যের মজুদ না থাকা স্বত্বেও ডিও ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে অদৃশ্যভাবেই এলাচের বেচাকেনা চলছে খাতুনগঞ্জে। মূলত এ কারণেই ঢাকার তুলনায় চট্টগ্রামে এই মসলা পণ্যের দাম বেশি বলে দাবি করেছেন প্রকৃত মসলা ব্যবসায়ীরা। ডিও ট্রেডিং সরকার নিয়ন্ত্রিত নয়। ফলে এটি ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্যবসা পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। যেসব ব্যবসায়ীরা ডিও ট্রেডিংয়ে জড়িত তাদের কোনো ইনভেন্টরি বা দোকান-অফিস না থাকা স্বত্বেও তারা সহজেই বড় অঙ্কের ডিও চুক্তি কেচাবেচা করে বাজারমূল্যে কারসাজি করতে পারেন। এতে পণ্যের হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধি, এমনকি দরপতনও হতে পারে। এতে করে ভোক্তা ও ব্যবসায়ী উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

গত রবিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খাতুনগঞ্জের সোনামিয়া মার্কেটের নীচ তলায় শত শত লোকের ভিড়। কারো হাতে কিংবা দোকানে কোনো পণ্য মজুদ না থাকলেও তারা সবাই পণ্য বেচাকেনা করছেন। বাজারে আগন্তুক এসব লোকজন মূলত পণ্যের বদলে ডিও বেচাকেনা করছেন।

মার্কেটের জাহানার এন্টারপ্রাইজের সামনে দাঁড়ানো ইব্রাহিম হোসেন জানান, তিনি খাতুনগঞ্জে তেল, চিনি ও এলাচসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করেন। গত তিন-চার বছর ধরে তিনি এসব পণ্যের ব্যবসা করলেও তার কোনো দোকান বা অফিস নেই। সরাসরি ব্যবসায়ী নন, এমন অনেকে জুয়ার মতো করে কাগজ বেচাকোন করছেন। রবিবার তিনি ২ টন এলাচ বিক্রি করেছেন কেজিপ্রতি ৩৯০০ টাকা দামে, যা গত বুধবারে ২,৭০০ টাকা দরে কিনেছিলেন তিনি। এতে গত চার দিনের ব্যবধানে তার মুনাফা হয়েছে ৪ লাখ টাকা।

এই ব্যবসায়ী বলেন, “গত চারদিনে কেজিতে ২০০ টাকা না বেড়ে উল্টো কমতে পারতো। ডিও ব্যবসা হলো অনেকটা জুয়া খেলার মতো। এখানে যেকোনো সময় পণ্যের দাম উঠা-নামা করে। ফলে লাভ-লসের ঝুঁকি বেশি।”

অপর ব্যবসায়ী রাজু সাহা বলেন, “বাজারের সোনামিয়া মার্কেট, এজাজ মার্কেট, বাদশা মার্কেটে ও এমজি মার্কেট চলে এসব ডিও ব্যবসা। সাধারণত বেশিরভাগ সময় চিনি ও ভোজ্যতেলকে ঘিরে ডিও বেচাকেনা হয়। তবে চিনি ও ভোজ্যতেলের দাম ও বিকিকিন কম থাকলে এসব ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো একটি পণ্যকে ঘিরে এই ডিও ব্যবসাকে চাঙ্গা করে তোলেন।”

খাতুনগঞ্জে ডাল ও মসলার পাইকারি ব্যবসায়ী মেসার্স হক ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী আজিজুল হক বলেন, “খাতুনগঞ্জে এখন এলাচ নিয়ে যা হচ্ছে, তা ব্যবসায়ের পর্যায়ে পড়ে না। এখানে এলাচের পরিবর্তে স্লিপ (কাগজ) বেচাকেনা হচ্ছে। কিছু ব্যবসায়ীর সঙ্গে অব্যবসায়ী মিলে এসব কাগজ বেচাকেনা করে এলাচের বাজার অস্থির করে রেখেছে। এসব স্লিপ বেচাকেনা করে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেকে উধাও হয়ে যেতে পারে। অতীতেও মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়ে অনেকে খাতুনগঞ্জ থেকে পালিয়ে গেছে। এটা জুয়া খেলা। একজনের পকেটের টাকা অন্যজনের পকেটে চলে যাচ্ছে।”

চলতি বছর ২০২৪ সালের প্রথম দুই মাসে (২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) ১৩টি প্রতিষ্ঠান ২৩৭ টন ৮০ কেজি এলাচ আমদানি করেছে। ঘোষিত মূল্য ও রাজস্বসহ প্রতি কেজি এলাচের দাম পড়েছে ১,২৬৭ টাকা। গত বছর ২০২৩ সালে ৮৫টি প্রতিষ্ঠান ৪,৬৭৭ টন ২৯০ কেজি এলাচ আমদানি করে। আমদানিকারকদের ঘোষিত মূল্য ও রাজস্বসহ প্রতিকেজি এলাচের আমদানি খরচ পড়ে ১,২৫৭ টাকা করে।

এর আগে, ২০২২ সালে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান রেকর্ড ৬ হাজার ১ টন ২০৫ কেজি, ২০২১ সালে ৭০টি প্রতিষ্ঠান ৪,৩৯৫ টন ৮০ কেজি, ২০২০ সালে ৬০টি প্রতিষ্ঠান ৩,১০১ টন ৬৮৩ কেজি এবং ২০১৯ সালে ৫০টি প্রতিষ্ঠান ৩,৬৭১ টন ২৫৬ কেজি এলাচ আমদানি করে।

আমদানিকার ও ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১৮ সালে গুয়াতেমালায় এলাচ উৎপাদন কম হওয়ায় পণ্যটির দাম নিয়ে বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ওই সময় প্রতিকেজি এলাচ ১,৫০০-২,০০০ টাকা থেকে বেড়ে ৫,০০০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। পরের দুই বছর আমদানিকারকরা এলাচ আমদানি কমিয়ে দেন। অস্থিরতার সুযোগে খাতুনগঞ্জের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ২০২২ সালের দিকে এলাচে বিনিয়োগ শুরু করেন। এরপর থেকে পণ্যটির আমদানি বাড়তে থাকে দেশিয় বাজারে।

চট্টগ্রাম বিভাগের জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ বলেন, “এলাচ নিয়ে বর্তমানে চলতে থাকা অবৈধ ব্যবসা সম্পর্কে আমরা অবগত। যেকোনো একক পণ্যকে কেন্দ্র করে ব্যবসা অবৈধ। আগে, আমরা তেল এবং চিনির ক্ষেত্রে এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা তৈরি হতে দেখেছি। অবিলম্বে আমরা অবৈধ এই ব্যবসা প্রতিরোধে বাজারে প্রচারণা চালাব।”

আজকের সারাদেশ/জেসি/এমএইচ