রাত ১২:৩৩, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

হাজার কোটি টাকা জলে, পানি ‘অপচয়’ আরও বেড়েছে!

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

চট্টগ্রাম ওয়াসার কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-০২) অধীনে নগরীতে ৭০০ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন পাইপলাইন ও পানি সরবরাহে আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ১০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার কথা। অথচ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হওয়ার পর অ-রাজস্বভুক্ত পানির হারতো কমেনি, উল্টো বেড়েছে। হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেও অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার কমানো না গেলে এর উদ্দেশ্যে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে চট্টগ্রাম ওয়াসার অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ৩১ থেকে ৩৫ শতাংশে গিয়েও ঠেকেছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন এলাকায় প্রায় ৪৭ হাজার সংযোগ রয়েছে। এসব এলাকায় অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ৫ শতাংশের কম। রাজস্ব শাখার হিসাবে গদল আছে। রাজস্ব শাখার মিটার পরির্দশকদের অনিয়ম, অবৈধ লাইন পরিচালনার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা জেছে, ২০১৩ সালে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-০২) অধীনে একটি প্যাকেজের মাধ্যমে অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির একটি প্যাকেজে পুরো শহরে ৭০০ কিলোমিটার ডিস্ট্রিবিউশন পাইপলাইন, ৫৯টি ডিএমএ ডিস্ট্রিক্ট মিটারিং এরিয়া ও আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন সুপারভাইসরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডাটা অ্যাকুইসিশন-এসসিএডিএ সিস্টেম স্থাপন করা হয়। ফলে দুই ধাপে মাস্টার মিটার বসিয়ে তিন ধাপে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পানি সরবরাহের নির্ভুল তথ্য পাওয়ার কথা ছিল। মাস্টার মিটারের সঙ্গে গ্রাহক মিটার তথ্য মিলালে গ্রাহক পর্যায়ে অনিয়মের সুযোগ থাকে না। এছাড়া পুরো ডিএমএ সিস্টের মাধ্যমে পানির চাপ ও সরবরাহ তথ্য পর্যবেক্ষণ করলে লিকেজ বা অতিরিক্ত পানি প্রবাহ চিহ্নিত করার সুযোগ রয়েছে। এই প্যাকেজের কাজে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। গত বছরের জুনে প্রকল্পটি সম্পন্ন হয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রকল্পটি আধুনিক প্রযুক্তিগুলো পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় সংযুক্ত করা হয় ২০২২ সালের জুন মাস থেকে। ধাপে ধাপে ২০২৩ সালের জুনে সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রাম ওয়াসায় বর্তমানে মোট সংযোগের সংখ্যা ৮৮ হাজার ৭৭১টি। এরমধ্যে আবাসিক ৮২ হাজার ৬৪২টি এবং বাণিজ্যিক ৬ হাজার ১২৯টি। এরমধ্যে প্রায় ৪৭ হাজার সংযোগ ডিএমএ ব্যবস্থাপনার আওতায় এসেছে। অর্ধেকের বেশি সংযোগ নতুন ব্যবস্থাপনার আওতায় আসলেও অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার কমেনি। উল্টো আগের তুলনায় অ-রাজস্বভুক্ত পানির পরিমাণ বেড়েছে।

প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে হিসেব করলে ২০২৩ সালের জুলাই মাসে অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ছিল ৩৫ শতাংশ, আগস্ট মাসে ৩২ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে ৩১ শতাংশ করে ছিল। অথচ ২০১৮ সালেও এই হার কোনো কোনো মাসে ১৫ শতাংশও ছিল।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ১০ শতাংশের কম। কোন কোন এলাকায় ২ শতাংশও কম। রাজস্ব শাখার হিসাবে গলদ রয়েছে। এতো পানি কোথায় যায় এটি তাদের মাথা ব্যাথা।

প্রকল্পটির পরিচালক ও চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, “প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার আগে ঠিকাদার ও পরামর্শক সংস্থা ও ওয়াসা মিলে নিরীক্ষা করেছে। অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ১০ শতাংশের কমে নেমেছে। বিষয়টি একাধিক সভায় আলোচনা হয়েছে। রাজস্ব শাখা বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা।”

প্রকল্পটির নথিপত্রে মোট ৫৯টি ডিএমএর মধ্যে ৩৯টি ডিএমএর অ-রাজস্বভুক্ত পানি হার নিরীক্ষার তথ্য পাওয়া গেছে। এতেও দেখা গেছে, অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার সর্বনিম্ন ০.২ শতাংশ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৪ শতাংশ। তবে বেশিরভাগ ডিএমএতে তা ১০ শতাংশের কম। অ-রাজস্বভুক্ত পানির হিসাবের গড়মিল নিয়ে ২০২০ সালে অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধান চালিয়েছিল সংস্থাটি। এতে উঠে আসে লিকেজ সমস্যার কারণে উৎপাদিত পানির মাত্র ৩.৮৯ শতাংশ অপচয় হয়। বাকি পানি অবৈধভাবে বিক্রি বা আহরণ করা হয় বলে অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা রুমন দে বলেন, “একটি পাত্র থেকে অন্য পাত্রে পানি কিছু পানি নষ্ট। ওয়াসায় যতটুকু উৎপাদন, ততটুকু সরবরাহ হিসেব করা হয়। পাইপলাইন দিয়ে পানি সরবরাহের সময়ও কী কিছু পানি অপচয় হয় না? মাটির ৮-১০ ফুট নিচেও পাইপলাইন আছে। অনেক সময় লিকেজ হয়। এছাড়া অবৈধ ও বাইপাসসের মাধ্যমে লাইন নিয়ে পানি বিক্রি করা হয়। এসব কারণে সিস্টেম লস হয়। তবুও অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার অনেক বেশি। এজন্য আমরা অবৈধ সংযোগসহ সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। চট্টগ্রাম ওয়াসার তিন জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট গত তিন মাসে প্রায় ৪০টি অভিযান চালিয়েছে নগরীর ২, ৩৮, ৩৯ ও ৪০ সম্বর ওয়ার্ডে। প্রায় ২৫০ এর বেশি অবৈধ সংযোগ পেয়েছি। বাইপাস লাইন দিয়ে ড্রেনের নিচে নিয়ে যায়। জরিমানা, বিনাশ্রম কারাদণ্ডের মতো শাস্তি দিয়েছি।”

বছরে ১৭০-২০০ কোটি টাকার পানি হিসাব নেই:

চট্টগ্রাম ওয়াসার তথ্যমতে, বর্তমানে সংস্থাটির দৈনিক পানি উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫০ কোটি লিটার। শেখ রাসেল পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে দৈনিক ৯ কোটি লিটার, শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার প্রকল্প থেকে ১৪.৩ কোটি লিটার, শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার-০২ থেকে ১৪.৩ কোটি লিটার এবং মোহরা পানি সরবরাহ প্রকল্প থেকে ৯ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করা হয়। বাকি এক থেকে দেড় কোটি লিটার আসে ভূগর্ভস্থ খাত থেকে। নগরীর ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে এখনো ওয়াসার পানি পৌঁছেনি।

সংস্থাটির পানি শোধনাগারে প্রতি এক হাজার লিটার পানির উৎপাদন ব্যয় ৩১ দশমিক ৮০ টাকা। এ হিসেবে দৈনিক মাসে ১৪ থেকে ১৭ কোটি টাকার পানির হিসাব পাচ্ছে না সংস্থাটি। বছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৭০-২০০ কোটি টাকা।

জাইকা পরিচালিত সমীক্ষার হিসাবে, চট্টগ্রামে একজন নাগরিকের জন্য প্রতিদিন গড়ে ১২০ লিটার পানি প্রয়োজন। এ হিসাবে ওয়াসার অ-রাজস্বভুক্ত পানিও ব্যক্তি পর্যায়ে ৩-৫ কোটি মানুষের ব্যবহার উপযোগী।

বছরে ১৭০-২০০ কোটি টাকার পানির হিসাব না পেলেও পানি অতিরিক্ত ব্যয়ের ভার গ্রাহকের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে সংস্থাটি। পরে গত ১৬ এপ্রিল বোর্ড সবায় সুপারিশ করা হয়, আবাসিক সংযোগে ৩০ শতাংশ এবং অনাবাসিক সংযোগে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির। বর্তমানে প্রতি ঘনমিটার (এক হাজার লিটার) পানির দাম আবাসিক সংযোগে ১৮ টাকা এবং অনাবাসিক সংযোগে ৩৭ টাকা। এবার আবাসিকে ১৮ টাকার স্থলে ২৩ দশমিক ৫০ টাকা এবং অনাবাসিকে ৩৭ টাকার স্থলে ৫৫ দশমিক ৫০ টাকা করতে চায় ওয়াসা। সংস্থাটি পানির চুরি, বাইপাস লাইনের মাধ্যমে অবৈধ সংযোগ, অবৈধভাবে বিক্রি বন্ধ না করে অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা গ্রাহকের ঘাড়ে চাপাতে চাইছে বলে মনে করছেন গ্রাহকরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) একেএম ফজলুল্লাহ বলেন, “মিটার রিডিংয়ের সমস্যা আছে। ১৫-২০ তলা ভবন, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানেও অবৈধ সংযোগ আছে। এসব কারণে হিসাবের বাইরেও পানি যাচ্ছে। অনেক জটিল সমস্যা। আমরা চেষ্টা করছি, অভিযান চালাচ্ছি। আগামী ৩-৪ মাসের মধ্যে অ-রাজস্বভুক্ত পানির হার ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এরপর আবার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হবে। এভাবে ধাপে ধাপে কাজ করা হবে।”

আজকের সারাদেশ/জেএম