রাত ১:০৬, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

অবশেষে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে নিয়মিত ট্রেন চালুর প্রস্তাব

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

রাষ্ট্রীয় পরিবহন সেবা সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে আয়ের বিপরীতে দ্বিগুণ ব্যয়ের ভারে লোকসানের তকমা থেকে বের হতে পারছে না বহু বছর ধরে। অপ্রয়োজনীয় রুটে রাজনৈতিক বিবেচনায় ট্রেন চালু, অজনপ্রিয় রুটে ট্রেন চলাচল করার কারণে বেশিরভাগ ট্রেন খরচ তুলতে পারে না। অথচ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চাহিদা থাকার পরও ট্রেন চালু করেনি রেলওয়ে। গত রমজান ঈদের আগে এই রুটে চালু হওয়া বিশেষ ট্রেন সবসময় সক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করেছে। এই অঞ্চলের মানুষের দাবি প্রেক্ষিতে চাহিদা বিবেচনায় বিশেষ ট্রেনটিকে নিয়মিত চালুর প্রস্তাব দিয়েছে রেলওয়ের চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তর (ডিআরএম)।

গত বৃহস্পতিবার (০৯ মে) ডিআরএমের দপ্তর থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দপ্তরে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠানো। একটি ট্রেনকে দুই ট্রিপ অর্থাৎ দুই জোড়া হিসেবে চালানোর কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের ঈদ বিশেষ ট্রেনটি গত ৮ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত মোট ২৫ দিনে (৩দিন চলাচল বন্ধ ছিল) ৫১ লাখ ২৫ হাজার ৩৬২ টাকার রাজস্ব আয় করেছে। ওই ট্রেন ১০টি বগিতে মোট ৪৩৮টি আসন ছিল। তবে যাত্রীর চাহিদা বিবেচনায় অতিরিক্ত বগি সংযোজন করে ৫০০-৫৫০ আসনের ব্যবস্থাও করা হতো। এরপরও যাত্রীদের চাহিদা থাকতো। ঈদের পরে অন্যান্য রুটের বিশেষ ট্রেন বন্ধ করা হলেও চাহিদা থাকায় এটি ২০ মে পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়।

ডিআরএম দপ্তরের প্রস্তাবে বিশেষ ট্রেনটি নিয়মিত করে এক ট্রিপের পরিবর্তে দুই ট্রিপ (দুই জোড়া) চালানো কথা বলা হয়। উতে উল্লেখ করা হয়, পর্যটন নগরী কক্সবাজার ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে যাতায়াতকারী যাত্রী সাধারণের ভ্রমণের সুবিধার্থে বর্তমানে ১০ বগির পরিবর্তে ১৮ বগিতে নিয়মিত চালুর পাশাপাশি আরো এক জোড়া ট্রেন পরিচালনা অতীব প্রয়োজন। এতে করে যাত্রী চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রেলওয়ের ভাবমূর্তি ও রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। প্রস্তাবটি রেল ভবনে গিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে। ১৮ বগিসহ ট্রেন চালু হলে প্রায় সাড়ে আটশ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন প্রতি ট্রিপে।

রেলওয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ব্যবস্থাপক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, এই রুটের যাত্রী বেশি। আয়ও ভালো। বিষয়গুলো বিবেচনা করে একটি ট্রেন, দিনে দুই বার যাতায়াতের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবের সঙ্গে আয়ের হিসেবও যুক্ত করা হয়েছে। তারা আশা করছেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটি বিবেচনা নেবে।

নয় দশকের অপেক্ষার পর চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের রেলসংযোগ স্থাপনের বিষয়টি ডাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হলেও শুরু থেকেই উপেক্ষিত চট্টগ্রাম। প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত প্রায় ১০১ কিলোমিটার রেলপথ গত বছরের ১১ নভেম্বর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ডিসেম্বর থেকে দুই ধাপে ঢাকা থেকে কক্সবাজার রুটে দুটি বিরতিহীন আন্তঃনগর ট্রেন চালু করে রেলওয়ে। চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন চালু না হওয়ায় সমালোচনা মুখে প্রতিটি ট্রেনের দুটি কোচের মাত্র ১১০টি আসন চট্টগ্রামের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।

ব্রিটিশ আমলে ১৯৩১ সালে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করা হয়েছিল। এরপর বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। দীর্ঘ ৯২ বছর পর অঞ্চলে রেল যোগাযোগ স্থাপন হয়। নতুন করে চট্টগ্রামের দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এবং কক্সবাজারের হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজারা, ইসলামাবাদ, রামু ও ঝিলংজা ৯টি স্টেশন নির্মাণ হয়। দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের অন্তত আটটি উপজেলার যাতায়াত ব্যবস্থা সহজ হওয়ার পাশাপাশি এই রেলপথ এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করবে বলেও প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ট্রেন চালুর বিষয় রেলওয়ের অনাগ্রহের কারণে উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কক্সবাজারে বাজারে ব্যাগ সরবরাহকারী গোলাম সামদানি টিটু বলেন, সপ্তাহে দুই-তিন বার চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াত করতে হয়। এই রুটে নিয়মিত ট্রেন চালু  হলে আমাদের কোন উপকার হবে। এই রুটের নিয়মিত ট্রেন চালু না হলে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলার লাখ লাখ মানুষও কোন উপাকার পাবে না।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই রুট নিয়ে মানুষের প্রচুর আগ্রহ রয়েছে। প্রতিদিন গড় ৪০ হাজার মানুষ কক্সবাজারে যাতায়াত করে। ১০ হাজার মানুষও যদি ট্রেনে ওঠেন, তবে এটি হবে সবচেয়ে লাভজনক রুট। কিন্তু ইঞ্জিন সংকটের কারণে অপেক্ষার পালা দীর্ঘ হচ্ছে। অথচ রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাকা-নোয়াখালী এবং ঢাকা-সিলেট পর্যাপ্ত ট্রেন থাকার পরও শিগগিরেই চালু হতে যাচ্ছে আরো এক জোড়া করে নতুন ট্রেন। এসব রুটের পরিবর্তে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চালু হলে রেলের লাভ এবং মানুষের উপকার দুটোই হতো। কক্সবাজারের দুই লেনের মহাসড়ক হওয়ায় পথে দুর্ভোগের পাশাপাশি নিয়মিত দুর্ঘটনাও ঘটে। অন্যদিকে বাসের চেয়ে অর্ধেক ভাড়ায় ট্রেনে ভ্রমণ করা যাবে। এসব কারণে এই রুটটি যাত্রী টানবে।

তবে রেলওয়ের নতুন মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত আলী দায়িত্ব গ্রহণের পর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে নিয়মিত ট্রেন চালুর বিষয়টি সংস্থাটির এক নম্বর প্রায়োরিটিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। গত ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিআরবিতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, “আমরা নীতিগতভাবে একমত; চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন দিতে হবে। এটা এক নম্বর প্রায়োরিটি। আমরা জানি এই রুটে ট্রেন চালু হলে মানুষের কষ্ট কম হবে। রেলওয়ের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। সমস্যা হচ্ছে জনবল ও ইঞ্জিন সংকট।”

আজকের সারাদেশ/জেএম