রাত ১২:৫৭, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

জিম্মি জাহাজ থেকে ফিরছেন স্বামী, তাই মেহেদির রঙে রাঙলেন জান্নাতুল


আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন

মেহেদিরাঙা আঙুল। হাতে নিজেরই বানানো কেক। আর এক গোছা রজনীগন্ধা। হিজাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা মুখটার উচ্ছ্বাস দেখা না গেলেও আঁচ করা যাচ্ছে সহজেই। জলদস্যুদের ঢেরায় টানা এক মাসের দমবন্ধ টানাপোড়েন, কত শত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, বাঁচা-মরার লড়াই ফেরিয়ে দেশে ফেরা স্বামী নুরউদ্দীনসহ ২৩ নাবিককে নিয়ে আসা এমভি জাহান মণি চোখের দৃষ্টিসীমায় হাজির হতেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন জান্নাতুল ফেরদৌস। একটু পর ভিড় ঠেলে এই নারী এগিয়ে গেলেন জাহাজছোঁয়া দূরত্বে। মই বেয়ে স্বামী নামতেই বলে উঠলেন, ‘বাড়িয়ে দাও, তোমার হাত, আমি আবার তোমার আঙুল ধরতে চাই।’
 

৮ মে ছিল নূরউদ্দিন-জান্নাতুল দম্পাতির বিয়ের চার বছর পূর্তি। গত বছরের ২৫ নভেম্বর নূরউদ্দিন বিদায় নেওয়ার সময় কথা দিয়েছিলেন একসঙ্গে দিনটি দুজনে কাটাবেন একান্তে। কিন্তু স্বামী দস্যুদের কবলে পড়ে এক মাস জিম্মি থাকায় দীর্ঘ হয়েছে জান্নাতুলের অপেক্ষা। স্বামী পাশে ছিলেন না বলে ঈদেও ছিল না হাসি, বিয়েবার্ষিকীর দিনেও এই নারীর সঙ্গী ছিল মনখারাপী। অবশেষে স্বামী নিঃশ্বাসের দূরত্বে। জান্নাতুলও তাই বহুদিনের দুঃখের পর পেলেন হাসার একটা দিন!

নাবিকেরা জাহাজ থেকে নামতেই পড়তে হয় গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে। এই ‘মধুর যন্ত্রণা’ এড়াতে স্বামীকে ভিড় থেকে একটু দূরে নিয়ে যান জান্নাতুল। স্বামীকে পাশে বসিয়ে মনে মনে যেন বলছিলেন-‘কতদিন পরে এলে, একটু বসো। তোমায় অনেক কথা বলার ছিল যদি শোন।’ নূরউদ্দিনও উজাড় করে বলছিলেন জমানো সব কথা। কীভাবে জিম্মি হলেন, কেমন কেটেছিল দস্যুদের সঙ্গে কাটানো সেই সব ভয়াল দিনরাত্রী, তারপর মুক্তির আনন্দ, দেশে ফেরা-সবকিছুই।

‘ব্যক্তিগত আলাপ’ শেষ হলো, এবার আর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে বাঁধা নেই জান্নাতুলের। হাসতে হাসতেই বললেন, ‘কতদিন মানুষটাকে দেখিনি। দসূ্যদের ভারি ভারি অস্ত্রের মুখে ছিল, ভয়ে গলা শুকিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। স্বামী বারবার আশ্বস্ত করছিল দস্যুরা কিছুই করেনি। তবুও একটু কাছাকাছি বসে ভালোভাবে পরখ করলাম দস্যুরা কোনো আঘাত করেনি তো। স্ত্রীর মন-বোঝেন তো?’ কথা শেষ করে আরও একবার অট্টহাসি জান্নাতুলের।

স্বামী আসবেন, তাঁকে নিজের চোখে সরাসরি দেখবেন-সেই অপেক্ষায় রোববার রাতভর ঘুম হয়নি জান্নাতুলের। ‘রাত ২টা পর্যন্ত কেক বানালাম, স্বামীর পছন্দের খাবার রাঁধলাম। এরপর ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু রাত চারটা হতেই ভেঙে যায় ঘুম। তারপর থেকে শুধুই অপেক্ষা-কবে বাজবে বিকেল চারটা।–এক লহমায় বলে গেলেন জান্নাতুল।

নাবিক মানেই জলে ভাসা জীবন। এই বন্দর থেকে ওই বন্দরে ছুঁটে চলা। তুমুল একাকীত্ব তো আছেই, সঙ্গে আছে সামুদ্রিক ঝঞ্ঝা আর দস্যুদের শিকার হওয়ার ভয়। ২০২০ সালে নুর উদ্দিনকে বিয়ের আগে কেউ কেউ সেই সব কথা মনেও করিয়ে দিয়েছিলেন জান্নাতুলকে। কিন্তু এসব কিছুই গ্রাস করতে পারেনি এই তরুণীকে, নূরউদ্দিনকে যে তাঁর খুব মনে ধরে গিয়েছিল। সেই কথা আরেকবার তুলে ধরে বললেন, ‘প্রথম যখন শুনলাম তাদের জাহাজ দস্যুদের কবলে পড়েছে। তখন যেন আমার পুরো পৃথিবীটাই শেষ হয়ে গিয়েছিল। আজ সে আমার কাছে ফিরে এসেছে। এই যে হাসছি, এই উপলক্ষ পেতে বহুদিন কাঁদতে হয়েছে আমাকে।’

স্বামীকে নিয়ে একসঙ্গে বিয়ে-বার্ষিকীর কেক কাটা হয়নি বলে কি ফুরিয়ে যাবে উৎসব। সেটি যে হওয়ার নয়। হাতে তাই তো জান্নাতুল মেহেদী লাগিয়েছেন। নিয়ে এসেছেন নিজেরই বানানো দুটি চকলেট কেক। মেহেদিরাঙা হাত দেখিয়ে নিজেই বললেন, ‘ওকে তো হারিয়েই ফেলেছিলাম। এখন নতুন করে আবার পেলাম। ও যেমন নতুন জীবন পেল, আমিও তো স্বামীকে নতুন করে পেলাম। দিনটি স্মরণীয় রাখতেই হাতে মেহেদী লাগানো, কেক বানানোর এত এত আয়োজন।’

মায়ের কোলে চড়ে বাবাকে অভিবাধন জানাতে আসা আড়াই বছরের সাদ বিন নূরের অবশ্য বাবা কি সেটি এখনো ঠিকঠাক বোঝার বয়স হয়নি। আনমনে নিজের ছন্দে খেলছিল সে। মাঝে মাঝে আবার শিশুমনের দুষ্টুমিও করছিল। কিন্তু বাবা হাত বাড়াতেই যেভাবে বুকে লুকিয়ে যেভাবে চুপসে গেল-বোঝা গেল বাবার ওমের অপেক্ষায় ছিল সেও।

ছেলেকে কোলে নিয়ে নূর উদ্দিনও আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। এই যে ছেলে আবার পুনর্দখল করল বাবার বুক, কেমন লাগছে- প্রশ্নের উত্তরটা ঠিক গুছিয়ে বলতে পারলেন না নূরউদ্দিন।অস্ফুট স্বরে শুধু বলছিলেন, ‘দস্যুদের কবলে পড়ার পর থেকে ছেলের মুখটা চোখে ভাসত। আমি না থাকলে ছেলের কি হবে ভাবতাম। আর মনে পড়দ মা-বাবা-স্ত্রীর কথা। আল্লাহকে ধন্যবাদ তিনি আমাদের পুনরায় বাড়িতে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমরা যেন দ্বিতীয় জীবন পেলাম।’

সময়ের বয়স বেড়েই চলেছিল। ঘড়ির কাটায় তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা পেরিয়ে ছয়টার ঘরে ছুঁটছে। চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি-১ জেটিতে নাবিকদের বরণে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়োজনও শেষের দিকে। এবার প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে ঘরে ফেরার পালা।

তার আগে স্বামীকে এরপর কি সমুদ্রে পাঠাবেন-আশপাশ থেকে এই প্রশ্নটা উড়াউড়ি করতেই মনটা যেন ফের বিষণ্ন হয়ে ওঠল জান্নাতুলের। আদ্র হয়ে ওঠে চোখের পাতা। ছায়াছবির মতো যেন এই নারীর চোখের পর্দায় ভেসে ভেসে আসছিল স্বামীর জিম্মির সেই শেষ হতে না চাওয়া ৩০ দিন। আবেগ কিছুটা প্রশমিত করে শুধু বললেন, ‘সমুদ্রই তো ওর জীবন-জীবিকা আর আমাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। তাই সমুদ্রে তো যেতেই হবে।’

দূরে কোথাও তখন যেন ভেজানো কণ্ঠে কেউ গেয়ে চলছিলেন রবীন্দ্রনাথের সেই অমর সংগীত-‘দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল-আলোক তবে তাই হোক।’