রাত ১:২৩, মঙ্গলবার, ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

১৪ বছর ধরে দড়ির সাহায্যে মসজিদে যান অন্ধ মুয়াজ্জিন, নেন না কোনো পারিশ্রমিক

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:
আজ থেকে প্রায় ২০ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় দুই চোখের দৃষ্টি হারান মুয়াজ্জিন মো. আব্দুর রহমান মোল্লা। সেই থেকে এখনও মসজিদে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত আজান এবং নামাজ পড়ান তিনি। আর বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার রাস্তার পাড়ি দিতে সাহায্য নেন বাঁশ ও রশির। টেনে রাখা রশি ধরে ধরেই মসজিদে যান তিনি।

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের অন্ধ মুয়াজ্জিন হিসেবে পরিচিত আবদুর রহমান মোল্লা।

সরেজমিনে দেখা যায়, আব্দুর রহমান বাড়ি থেকে প্রতিদিনের মতো বের হন যোহরের নামাজের আজান ও নামাজ আদায়ের জন্য। লাঠির ওপর ভর করে বাড়ি থেকে বের হয়েই রশি ধরে ধরে মূল সড়কে ওঠেন। এরপর লাঠির সাহায্যে রাস্তা পার হয়ে বাঁশ আর দড়ি ধরে ধরে পৌঁছে যান মসজিদে।

পরিবার ও এলাকাবাসী জানায়, প্রায় ২০ বছর আগে একটি দুর্ঘটনার পর ধীরে ধীরে দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন আব্দুর রহমান মোল্লা। অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ২০১১ সালে পবিত্র হজ পালন করে আসেন। এরপর গ্রামে নিজের পাঁচ শতাংশ জমির ওপর তৈরি করেন একটি পাকা মসজিদ। সেই মসজিদে গ্রামের মানুষ ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নিজের স্থাপন করা মসজিদে নামাজ আদায় শুরু করেন আব্দুর রহমান। গত ১৪ বছর মসজিদের মুয়াজ্জিন ও ইমাম হিসেবে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। 

জানা গেছে, আব্দুর রহমান মোল্লার ১৯ ছেলে-মেয়ে ও দুই স্ত্রী রয়েছেন। এর আগে ৬ মেয়ে মারা যায়। আব্দুর রহমানের বেশিরভাগ ছেলে মেয়েই উচ্চশিক্ষিত এবং প্রতিষ্ঠিত। তার ছেলে-মেয়েদের মধ্যে শিক্ষক, কৃষি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, বিজিবি সদস্য, ব্যবসায়ী রয়েছেন। কেউবা আবার নিজেদের জমিজমা দেখাশোনা করেন।

আব্দুর রহমান মোল্লার ছেলে বরদেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মো. শফিকুল ইসলাম সাইফুল বলেন, প্রায় ২০ বছর আগে একটি দুর্ঘটনাজনিত কারণে আমার বাবার চোখে সমস্যা হয়। ধীরে ধীরে তিনি অন্ধ হয়ে যান। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি। পরে ২০১১ সালে বাবাকে নিয়ে হজ করে আসি। এরপর বাবার অর্থায়নে বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটি মসজিদ নির্মাণ করা হয়। সেখানে আমার পরিবার-পথচারী ও এলাকাবাসী নামাজ আদায় করেন।

তিনি বলেন, বাবার পরামর্শ অনুযায়ী প্রথম থেকেই বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত বাঁশ ও দড়ি টেনে দেওয়া হয়। প্রথমে কিছুদিন ছেলে ও নাতিরা বাঁশ ও দড়ি দেখিয়ে দিয়ে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যেতেন। এখন মাঝেমধ্যে নাতিরা মসজিদে নিয়ে গেলেও বেশিরভাগ সময় একা একাই মসজিদে যান বাবা। এ বয়সেও বাবা মসজিদে গিয়ে আজান দেন এবং নামাজ আদায় করেন, এটাই অনেক বড় পাওয়া।

আব্দুর রহমান মোল্লার ছোট ছেলে মো. সাগর হোসেন ইসরাফিল বলেন, বয়স হলেও আমার বাবা মসজিদে গিয়ে আজান দেন এবং ইমামতি করেন। এটা দেখে আমাদের বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চারাও মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করে। তিনি বলেন, বাড়ি থেকে বাবার মূল সড়ক পর্যন্ত যেতে তেমন সমস্যা না হলেও পাকা সড়ক পার হতে সমস্যা হয়। কেননা অনেক গাড়ি চলাচল করে সেখানে। এলাকার ছোট ছোট গাড়ি চালকদের বলা হয়েছে মসজিদের সামনে আসলে গাড়ি যাতে ধীরে চালিয়ে যায়।

এ ব্যাপারে মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান বলেন, ১০ কাঠা জমি বিক্রি করে সেই অর্থে মসজিদটি নির্মাণ করেছি। আল্লাহ যাতে মসজিদটিকে কবুল করেন এবং পরিবার-পরিজনসহ সবাইকে হেদায়েত দান করেন। আমি অন্ধ মানুষ, মসজিদে যাওয়া-আসা করে আনন্দ পাই। সকলেই যাতে মসজিদে এসে নামাজ পড়ে।
তিনি বলেন, এখন টিউবওয়েলে পানি না ওঠায় অন্য মানুষদের ওজু করতে সমস্যা হয়, মসজিদের পাশে একটা পানির পাম্পের ব্যবস্থা হলে খুব ভালো হতো। আমি প্রাণ ভরে দোয়া করতাম।

আজকের সারাদেশ/এমএইচ