সকাল ৭:৪৯, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঢাকার আকাশে কমেছে তারার উজ্জ্বলতা, নেপথ্যে দূষণ

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন

নানা দূষণের কারণে ঢাকার আকাশে এক ধরনের আস্তরণ তৈরি হয়েছে। ফলে এখানে তারার উজ্জ্বলতা হারিয়ে গেছে। রাজধানীর বাসিন্দারা এ আস্তরণ পর্যন্তই দেখতে পায়। এর বাইরের আকাশ তাদের চোখে পড়ে না। ফলে রাতের আকাশের তারার উজ্জ্বলতা ঢাকাবাসীর কাছে থেকে যায় অদৃশ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তারা দেখতে না পাওয়ার অন্যতম কারণ আলোক দূষণ। দায় আছে বায়ু দূষণেরও। ঢাকা এখন পৃথিবীর সবচেয়ে দূষিত বায়ুর শহরগুলোর অন্যতম।

ঢাকার বিপরীত চিত্র হাওরাঞ্চলে। রাতের আকাশে দেশে সবচেয়ে বেশি তারা চোখে পড়ে হাওরাঞ্চলে। এর বড় কারণ সেখানে নেই আলোর দূষণ; বায়ু দূষণও তুলনামূলক কম।

বাতাসের মান পর্যবেক্ষণকারী সুইজারল্যান্ডভিত্তিক সংস্থা ‘এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স’-এর (আইকিউ এয়ার) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ১০০ শহরের মধ্যে বায়ুদূষণে গতকাল ঢাকার অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। এ দিন ঢাকার বায়ু দূষণের মান সূচক ছিল ১৫৯। গত মার্চে এ স্কোর ছিল ২১২। এর আগে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় বায়ু দূষণের গড় মাত্রা ছিল ২৬৯।

আইকিউ এয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে তাকে ‘মাঝারি’ বা ‘গ্রহণযোগ্য’ মানের বায়ু ধরা হয়। ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ ধরা হয় ১০১ থেকে ১৫০-এর মধ্যে থাকলে। ১৫১ থেকে ২০০ হলে তা হয়ে যায় ‘অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু। আর ২০১ থেকে ৩০০ হলে তাকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু ধরা হয়। ৩০১ থেকে তার ওপরের স্কোরকে ধরা হয় ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে। প্রতিদিনের বাতাসের মান নিয়ে তৈরি করা একিউআই সূচক একটি নির্দিষ্ট শহরের বাতাস কতটুকু নির্মল বা দূষিত, সে সম্পর্কে তথ্য দেয় এবং কী ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা জানায়।

অন্যদিকে রাতের কৃত্রিম আলোর উজ্জ্বলতার হার পরীক্ষা করা যায় ‘নাইটপলিউশনম্যাপ’ ওয়েবসাইটে। তাতে দেখা যায়, গতকাল ঢাকায় রাতের আকাশে ঔজ্জ্বল্যের হার প্রতি বর্গমিটারে ছিল ২ হাজার ১২০ ম্যাক্রোক্যান্ডেলা। একই সময়ে সুনামগঞ্জ শহরে ছিল ৯৩ দশমিক ৯ ম্যাক্রোক্যান্ডেলা।

নাসার স্যাটেলাইট ম্যাপের তথ্যও বলছে, দেশের সবচেয়ে আলোকোজ্জ্বল শহর ঢাকা। এর মধ্যে কৃত্রির আলোর উজ্জ্বলতা সবচেয়ে বেশি গুলশান এলাকায়, ২ হাজার ২৫০ ম্যাক্রোক্যান্ডেলা। এখানে প্রাকৃতিক আলোর উজ্জ্বলতা ২ দশমিক ৪২ মিলিক্যান্ডেলা (এমসিডি)। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় প্রাকৃতিক আলোর উজ্জ্বলতা ২ দশমিক ১৫ এমসিডি, কৃত্রিম আলোর উজ্জ্বলতা ১ হাজার ৭৬০ ম্যাক্রোক্যান্ডেলা। অন্যান্য এলাকার মধ্যে কৃত্রিম আলোর উজ্জ্বলতা রমনা এলাকায় ১ হাজার ৮১০, গুলিস্তানে ১ হাজার ৯৬০ ও মিরপুর এলাকায় ৪৬২ ম্যাক্রোক্যান্ডেলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের (কারস) পরিচালক অধ্যাপক ড. ইশতিয়াক এম সৈয়দ বলেন, ‘ঢাকার আকাশে তারা না দেখা যাওয়ার প্রধান কারণ বায়ু দূষণ ও আলোক দূষণ।

সম্প্রতি ‘জার্নাল অব বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট প্ল্যানার্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে দেশের আলোক দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে সবচেয়ে বেশি আলোক দূষণ হয় ঢাকায়। ‘নেক্সাস বিটুইন লাইট পলিউশন অ্যান্ড এয়ার টেম্পারেচার: এ স্টাডি অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ গবেষণা করা হয় ২০০৩-২০১৩ সালের তথ্য নিয়ে। গবেষণাটি করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী সাইফুল ইসলাম ও নগর পরিকল্পনাবিদ অনিন্দ্য সুন্দর হাওলাদার।

গবেষণায় দেখা যায়, আলোক দূষণে ঢাকার পরই আছে চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রাজশাহী, যশোর ও রংপুর। ২০০৩ সালে সমগ্র বাংলাদেশের মাত্র ৭ দশমিক ১ শতাংশ এলাকায় আলো দূষণ হতো। কিন্তু এক দশক পর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০০৩ সালে শহর এলাকাগুলোয় আলো দূষণ লক্ষ্য করা যেত। কিন্তু ২০১৩ সালে সেই দূষণ শহরতলিতেও ছড়িয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোক দূষণ হয় রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে। শহরটিতে আলোর উজ্জ্বলতা বৈশ্বিক গড় উজ্জ্বলতার চেয়ে ৮ দশমিক ১ গুণ বেশি। ৭ দশমিক ৪ গুণ বেশি সৌদি আরবের মক্কা শহরের উজ্জ্বলতা। এছাড়া রাশিয়ার চেলিয়াবিনস্কির ৭ দশমিক ১ ও কুয়েতের কুয়েত সিটির উজ্জ্বলতা ৭ গুণ বেশি।

এ বিষয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) পরিবেশ ও নগরায়ণ সম্পাদক সুজাউল ইসলাম খান বলেন, ‘ঢাকার আকাশ প্রচুর ময়লার কারণে দূষণে আক্রান্ত। পৃথিবী থেকে ধূলিকণা ও সিসাসহ নানা রাসায়নিক গিয়ে ঢাকার আকাশে মিশে যাচ্ছে। এ কারণে ঢাকার আকাশে একটি আস্তর পড়েছে। এর বাইরে রয়েছে আলোক দূষণ।’ তিনি বলেন, ‘আকাশের তারা অনেক আলোকবর্ষ দূরে থাকার কারণে পৃথিবীতে তাদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় খুব সূক্ষ্মভাবে। কিন্তু আমাদের চারপাশে অনেক বেশি আলোর ঝলকানির কারণে সেই তারা আমরা দেখতে পাই না।’

জার্মানির লিবনিজ-ইনস্টিটিউট ফর ফ্রেশওয়াটার ইকোলজি অ্যান্ড ইনল্যান্ড ফিশারিজের (আইজিবি) পরিবেশবিদ ফ্রাঞ্জ হোলকেরের মতে, ‘রাতে যে কৃত্রিম আলো ব্যবহার হয়, তাতে স্বাভাবিক আলোকচক্র বাধাগ্রস্ত হয়। বাড়িয়ে দেয় আলোক দূষণ, যা পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। আর রাতের অতিউজ্জ্বল আলো মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়।’ ‘আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন’ জানায়, অতি তীব্র কিন্তু দুর্বল নকশার এলইডি বাতির নীল আলো মানুষের ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় হরমোন মেলাটোনিনের ক্ষেত্রে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘আলোক দূষণ প্রতিটি বাস্তুতন্ত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে নিশাচর সব পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ রাতে আস্তানা ছেড়ে বেরোতেই ভয় পায়। তাতে কমে যাচ্ছে বংশবিস্তার। একাধিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাতে যেসব এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে, তার তুলনায় কৃত্রিম আলোয় আলোকিত স্থানে নিশাচর পাখি ও পতঙ্গের পরাগায়ন কর্মকাণ্ড কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, অতি আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে দিনে চলাফেরা করা অনেক পাখি ও পতঙ্গকে রাতেও উড়তে দেখা যায়।’

তিনি বলেন, ‘কৃত্রিম আলোর কারণে নিশাচর পোকামাকড়ের প্রজনন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ভিদের পরাগায়ন পতঙ্গের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর তাতে দিন দিন ফলন কমছে উদ্ভিদের। জলজ প্রাণীর জীবনেও বিপদ ডেকে আনছে রাতের কৃত্রিম আলো।’