সকাল ৮:৩৩, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

শততম জাহাজে উড়তে যাচ্ছে লাল-সবুজের পতাকা

আজকের সারাদেশ প্রতিবেদন:

দেশীয় বহরে যুক্ত হতে যাচ্ছে শততম জাহাজ। এরমাধ্যমে বাংলাদেশের শিপিংখাত নতুন মাইলফল ছুতে যাচ্ছে। সর্বশেষ লাইবেরিয়ান জাহাজ ‘এমভি নিউ চাম্প’ ক্রয়ের মাধ্যমে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) শততম জাহাজে লাল-সবুজের পতাকা উড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সমুদ্রগামী জাহাজের শতক উপলক্ষে নতুন জাহাজটির নাম দিয়েছে ‘এমভি মেঘনা সেঞ্চুরি’। জাহাজটি নিবন্ধনের আবেদনটি চট্টগ্রামের নৌবাণিজ্য অফিসে রয়েছে।

এমজিআই কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জাহাজটি ৩ কোটি ৫৩ লাখ ডলারে কেনা হয়েছে। ডলারপ্রতি ১১৭ টাকা হলে বাংলাদেশি মুদ্রায় জাহাজটির ক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ৪১৩ কোটি টাকা। এর আগে দেশীয় বহরের ৯৯তম জাহাজটিও এমজিআইয়ের। ওই জাহাজটির নাম প্রস্তাব করা হয়েছে এমভি মেঘনা পাইওনিয়ার। জাহাজে দুটি আগামী মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে মেঘনা গ্রুপের হাতে তুলে দেবে বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। হস্তান্তরের পরই বিদেশি নাবিক নামিয়ে জাহাজ দুটিতে তোলা হবে দেশীয় ৪২ জন নাবিক।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল জানান, সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনা খাতে বিনিয়োগের পরপরই বিদেশি পণ্য পরিবহন করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা যায়। এছাড়া দেশীয় পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা যায়।

দুই প্রতিষ্ঠানের হাতে দেশের অর্ধেক জাহাজ:

নতুন দুটি জাহাজটি যুক্ত হলে এমজিআইয়ের বহরে সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা দাঁড়ালে ২৪। দেশের শিপিংখাতের আরেক প্রতিষ্ঠান কবির গ্রুপের (কেএসআরএম) বহরেও ২৪টি জাহাজ রয়েছে। অর্থাৎ এই দুটি প্রতিষ্ঠানের দ্বারা ৪৮ শতাংশ দেশীয় সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালিত হয়।

নৌবাণিজ্য অফিস ও চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের তথ্যমতে, মেঘনার বহরে থাকা সাড়ে ১৩ লাখ টন পণ্য পরিবহনক্ষমতার ২৪টি জাহাজে বিনিয়োগ হয়েছে ৫০ কোটি ডলার। কেএসআরএম গ্রুপের বহরে থাকা ২৪টি জাহাজে বিনিয়োগ প্রায় ২৯ কোটি ডলার। গ্রুপটির বহরে থাকা জাহাজের পণ্য পরিবহনক্ষমতা প্রায় ১৩ লাখ টন।

উদ্যোক্তা ও কাস্টমস হাউসের তথ্যমতে, দেশীয় বহরে সচল থাকা ১০০টি (নিবন্ধনের অপেক্ষায় থাকা জাহাজসহ) জাহাজ কেনায় বিনিয়োগের পরিমাণ ১৪৪ কোটি ডলার। যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১১৭ টাকা)। এর মধ্যে গত পাঁচ বছরে যুক্ত হওয়া ৭১টি জাহাজে বিনিয়োগ হয়েছে ১১৪ কোটি ডলার। মূলত দুটি গ্রুপ দেশীয় বহরকে এগিয়ে নিয়েছে।

সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনায় নানা ঝুঁকির পরও বিনিয়োগ থেমে থাকেনি দেশীয় উদ্যোক্তাদের। দেশীয় পতাকাবাহী ‘এমভি আবদুল্লাহ’ কিংবা ‘এমভি জাহান মণি’ সোমালিয়ার দস্যুরা ছিনতাই করেছিল। মুক্তিপণ দিয়ে ২০১১ সালে এমভি জাহান মণি এবং গত এপ্রিলে এমভি আবদুল্লাহ ছাড়িয়ে এনেছে গ্রুপটি। এরপরও নতুন বিনিয়োগে নিজেদের বহর বাড়িয়েছে কেএসআরএম। সম্প্রতি এমভি জাহান-১ নামে নতুন একটি জাহাজে বিনিয়োগ করেছে গ্রুপটি।

কেএসআরএম গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহরিয়ার জাহান রাহাত বলেন, সমুদ্রগামী জাহাজশিল্পে সরকারের নীতি এখন অনেক বেশি উদ্যোক্তাবান্ধব। এ কারণেই কেএসআরএম গ্রুপ ব্যবসা সম্প্রসারণের প্রয়োজনে নতুন নতুন জাহাজ বহরে যুক্ত করছে।

১৯৭৮ সালে অ্যাটলাস শিপিং লাইনস লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সানাউল্লাহ চৌধুরীর হাত ধরে বেসরকারি খাতে এই খাতে বিনিয়োগ শুরুর পর উত্থান-পতনেই আটকে ছিল দীর্ঘ সময়। এ অবস্থার পরিবর্তন হতে শুরু করে ২০১৮ সাল থেকে। সরকারি নীতিসহায়তা বাড়ার পর উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগ শুরু করেন। তা এখনো অব্যাহত আছে। বাল্ক ও জ্বালানি তেল পরিবহনের জাহাজের পাশাপাশি দেশীয় বহরে এলপিজি, কনটেইনার কিংবা ভোজ্যতেল পরিবহনের জাহাজ যুক্ত হয়েছে।

মেঘনা গ্রুপ ও কেএসআরএম ছাড়াও নতুন বিনিয়োগ আসছে শিপিংখাতে। দেশের ভোগ্যপণের অন্যতম আমদানিকারক টিকে গ্রুপ পরিবহন ব্যয় কমাতে এ খাতে বিনিয়োগ করছে। নিজেদের আমদানি পণ্য পরিবহনে ব্যয় কমাতে এবার গ্রুপটির সহযোগী প্রতিষ্ঠান সামুদা শিপিং লিমিটেড সমুদ্রগামী জাহাজে প্রথমবারের মতো নতুন বিনিয়োগ করেছে। গত মাসে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার (১৫৭ কোটি টাকা) ব্যয়ে ‘এমটি সামুদা’ নামে তেল পরিবহনকারী ট্যাংকার কিনেছে। ট্যাংকারটি ২৪ হাজার টন ভোজ্যতেল পরিবহনে সক্ষম।

টিকে গ্রুপের পরিচালক মোস্তফা হায়দার বলেন, ‘সমুদ্রগামী জাহাজশিল্পে সরকারের নীতি একটানা কয়েক বছরে ধরে বিনিয়োগবান্ধব হয়েছে। এ জন্যই এ খাতে বিনিয়োগ করেছি। অভিজ্ঞতা ভালো হলে এই খাতে আরও বিনিয়োগ করতে চাই।’

আমদানি-রপ্তানির সম্ভবনা কাজে লাগাচ্ছে:

গত অর্থবছরে (২০২২-২৩) সমুদ্রপথে পণ্য আমদানি হয়েছে ১১ কোটি ৪ লাখ টন। এ সময় পণ্য পরিবহন ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪৪৪ কোটি ডলার। দেশীয় জাহাজে এসব পণ্য পরিবহন করা গেলে দেশীয় খাতই আয়ের হিস্যা পাবে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, গত অর্থবছরে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন করে আয় হয়েছে ৬৮ কোটি ডলার। এই রপ্তানি আয়ের নেতৃত্বে রয়েছে দেশীয় জাহাজগুলো।

তবে জাহাজ নিবন্ধনকারী সংস্থা নৌবাণিজ্য অফিসের মুখ্য কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন সাব্বির মাহমুদ বলেন, সরকারি নীতিসহায়তা বাড়ায় সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনায় বেসরকারি উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসছেন। তবে সমুদ্রগামী জাহাজ পরিচালনা শিল্পে ব্যয়ের খাত অনেক। কোম্পানিগুলো নিজস্ব জাহাজের পাশাপাশি সমুদ্রগামী জাহাজ ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করলে আয়ের বড় সুযোগ তৈরি হবে। আবার রক্ষণাবেক্ষণ, রসদ সরবরাহ-জাহাজ পরিচালনায় ব্যয়ের এমন অনেক খাতে যদি ব্যবসার সুযোগ তৈরি করা যায়, তাহলে বিনিয়োগের সুফল আরও বাড়বে।

আজকের সারাদেশ/জেএম