সকাল ৬:৪৯, রবিবার, ৯ই আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ফেসবুক খুঁজে দিল ৩০ বছর আগে হারিয়ে ফেলা তিন বান্ধবীকে

আজকের সারাদেশ:
‘বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র’ ও গিরিধর দে-এর সহায়তায় ৩০ বছর পর হারানো বান্ধবীদের খুঁজে পেয়ে এক হলেন লিপিকা ইকবাল, মাকসুদা খানম (টুটু), সানোয়ারা বেগম এবং মাহমুদা খানম সীমা নামের চার বান্ধবী।

গত শনিবার “বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র” প্ল্যাটফর্ম, সংগ্রহশালা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের বিপুল সংখ্যক সদস্য সংখ্যা বিশিষ্ট ফেসবুক গ্রুপে পুরোনো একটি ছবিসহ রাত আনুমানিক ৯:৩০ টায় প্রচারের পরপরই পোস্টটি রাতারাতি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং উক্ত পোস্টেরই মন্তব্য কলামে ছবিতে থাকা বান্ধবীদের সন্তানেরা কমেন্ট করে সাড়া দেন। পোস্টের প্রথম ১০ মিনিটেই ছবিতে থাকা মাকসুদা খানম (টুটু) নামক একজনের সন্ধান পাওয়া যায়, এরপর রাত আনুমানিক ১০:৩০ এর ভেতর সানওয়ারা খানম নামক আরেকজনের সন্ধান মেলে এবং উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরবর্তীতে ছবিতে বাকি থাকা মাহমুদা খানম সীমা নামক বান্ধবীকেও ২৪ ঘণ্টার ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় এবং তৎক্ষণাৎ তাঁদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে যোগাযোগ করানো হয়।

পরশু, ১৮ মে (শনিবার) রাত আনুমানিক সারে নয় টায় স্মৃতিতে থাকা সম্বল ৩৪ বছর আগের পুরোনো ছবিসহ আবেগঘন এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়। পোস্টটি বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র গ্রুপে করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক প্রবাসী লিপিকা ইকবাল। ক্যাপশনে বান্ধবীদের হারানো স্মৃতি উল্লেখ করে বলেন:

“গত ৩০ বছর ধরেই খুঁজে চলেছি আমার এই তিন বান্ধবীকে।
ছবির সবচেয়ে বামে বসে আছি আমি (লিপি)।
আমার পাশে টুটু, তার পরে সীমা, আর সবার শেষে সানী। আমরা ১৯৯০ সালে তেজগাঁও কলেজে বিএ পাস কোর্সে ভর্তি হই। ওরা সবাই মগবাজারে থাকতো। আমি থাকতাম শেওড়াপাড়া।

যতদূর জানি-
বিয়ের পর সানী এলিফেন্ট রোডে ওর শ্বশুর বাড়িতে থাকতো। আর কোন সূত্র আমার হাতে নেই দেশ থেকে বহুদূরে নিউইয়র্কে থাকি। ইচ্ছে হলেও সন্ধান নেওয়ার উপায় নেই ভেবে ভেবে যখন বিষণ্ন ভগ্নহৃদয় হয়ে গিয়েছিলাম, আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম- তখনই এই পেজের কথা মনে হলো।

আমার বান্ধবীদের কেউ, তাদের পরিচিতদের কেউ আছেন এখানে? আমাকে দিতে পারেন এদের কারো একজনের সন্ধান?

অনেক ধন্যবাদ।”

এক পোস্টেই ২৪ ঘণ্টার ভেতর বান্ধবীদের খুঁজে পাওয়ায় শুভকামনা জানিয়ে বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র প্ল্যাটফর্মের কর্ণধার গিরিধর দে বলেন, গত ৩০ বছর ধরেই খুঁজে চলেছি আমার এই তিন বান্ধবীকে’ শিরোনামে পরশু রাতে যে পোস্টটি সারাদেশে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়েছে মূলত সেটির কাজ এবং প্রচার আমরাই করেছি। সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাস করা লিপিকা ইকবাল নামে এক প্রবাসী নারী দীর্ঘকাল যাবৎ নানাভাবে খুঁজেও ছবিতে থাকা তাঁর বান্ধবীদের সন্ধান পাচ্ছিলেন না। দীর্ঘকাল যাবৎ নানাভাবে খুঁজেও যখন কোনো সন্ধান বের করতে পারছিলেন না তখন উনার মনে পড়ে আমাদের প্ল্যাটফর্মের কথা। উনি দু-দিন আগেই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এরপর আমরা উনার তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রচার শুরু করি।
বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র প্রতিষ্ঠার পর ২০১৬ সাল থেকে দেশব্যাপী দুষ্প্রাপ্য দলিলাদি সংগ্রহ, চর্চা, গবেষণা, প্রচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষণের পাশাপাশি দেশ, জাতি ও সমাজের জন্য নানাধরণের মানবিক ও সমাজসেবামূলক কাজ করে আসছে। যারই ধারাবাহিকতায় কোনোপ্রকার পারিশ্রমিক ছাড়া এ জাতীয় অসংখ্য কাজ করার সুবাদে পূর্বে থেকেই এই প্ল্যাটফর্ম দেশে বেশ সুপরিচিত। তিনি আমাদের সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে প্রথমে তিনি এরপর উনার ভাগনে তৌফুর রহমান আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এরপর আমরা যাবতীয় তথ্য নিয়ে উনাদের বান্ধবীদের একত্রে থাকা একটি পুরোনো ছবিসহ প্রচারের ব্যবস্থা করি এবং খুঁজে পেতে কাজ শুরু করি। প্রচারের পরপরই আমরা কিছু সময়ের ভেতরেই ছবিতে থাকা ২ জনকে (টুটু এবং সানী) প্রচার হওয়া পোস্টের মন্তব্য কলামেই খুঁজে পাই। এরপরই পাওয়া যায় সীমা নামক ছবিতে বাকি বান্ধবীকে। পরবর্তীতে ওই রাতেই উনাদের সঙ্গে যোগাযোগও করানো হয়েছে।

দীর্ঘকাল যাবৎ হারানো বান্ধবীদের মুহূর্তের ভেতরেই খুঁজে পেয়ে উনি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে গিয়েছিলেন। কিছুসময় আগেও যেটি উনার নিকট স্বপ্নের মত ছিল তা মুহূর্তেই বাস্তব হওয়ায় খুব খুশি হয়েছেন তিনি। শুধু তিনিই নন, তাঁর পরিবার, বন্ধু, বান্ধবীরা সহ সারা দেশে এই ঘটনার সাক্ষী হওয়া লাখো মানুষ খুব খুশি হয়েছেন।

বান্ধবীদের খুঁজে পেয়ে পোস্টদাতা লিপিকা ইকবাল বলেন, “আমিতো ভাবতে ও পারিনি। আল্লাহ আমার মনের কথা শুনতে পেরেছেন আলহামদুলিল্লাহ”। এই পেজ না থাকলে তা কি সম্ভব হতো! ৩০ বছর এর একটা স্বপ্ন ৩০ মিনিটেই সত্যি হলো।

ছবিতে থাকা টুটু, সানী ও সীমা নামক অন্যান্য বান্ধবীরাও খুঁজে পাওয়ার এই আনন্দে তাঁদের অনুভূতি নানাভাবে প্রকাশ করেন।

খুঁজে পাওয়ার পোস্ট প্রচারের পর হাজার হাজার মানুষ সেখানে শুভকামনা জানিয়ে মন্তব্য করেন, শেয়ার করেন। অসংখ্য মানুষ খুঁজে পেতে দোয়াও করেন।

গিরিধর দে আরও বলেন, ৩০ বছর আগে বাংলাদেশে বান্ধবীদের হারিয়েছিলেন তিনি। বান্ধবীকে দেখার আকুলতার কথা ফুঁটে উঠেছে তার সেই লেখনিতে। সবাইকে খুঁজে পাওয়ার পর যখন আমরা ভার্চুয়ালি একটি সাক্ষাৎ এর আয়োজন করি এরপর সবাইকে যুক্ত করার পর প্রতি মুহূর্তে উনাদের খুশি দেখে আনন্দে ভাসছিলাম। দীর্ঘ দিনের জমে থাকা কথার মালায় বরফ গলেছিল। উনাদের নিজেদের একান্তে আলাপ করার জন্য ১ ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছিলো। ওই এক ঘণ্টাই একে অন্যকে পেয়ে তারা মেতে ওঠেন সুখ দুঃখের গল্পে।

আমরা ইতঃপূর্বেও এমন প্রায় ৪০ টি পরিবার, স্বজন কিংবা বন্ধুদের খুঁজে পুনর্মিলন করেছি। যার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছুঁয়ে গেছে লাখো মানুষের হৃদয়। এবারের অভিজ্ঞতাটা খুব ভালো ছিল।

“বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র” বারবার প্রমাণ করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ভালো কাজে ব্যবহার হলে এটি আমাদের জন্য সর্বদাই মঙ্গলকর।

আমরা ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাই সারা দেশবাসীকে এবং বিশেষ করে অনলাইন-অফলাইনে থাকা “বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র”-এর সকল সদস্য ও ফলোয়ারদের। এই মানুষগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণই আমাদের প্রতিবারই অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে দেয় এবং ইতিহাস সৃষ্টি করে। বন্ধুত্ব অমর হোক। সকলের জন্য শুভকামনা।